হলিউডের জনপ্রিয় পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের চলচ্চিত্রে বারবার ফিরে আসে পৃথিবীর শেষ দিন বা অ্যাপোক্যালিপ্সের ধারণা। তবে গ্রিক শব্দ অ্যাপোক্যালিপসিসের প্রকৃত অর্থ ধ্বংস নয় বরং উন্মোচন—পুরোনো যুগের সমাপ্তি ও নতুন যুগের সূচনা। নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘টেনেট’, ‘ওপেনহাইমার’ এবং আসন্ন ‘দ্য অডিসি’—সব কটিতেই এই প্রতীকী অর্থ লক্ষণীয়। সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিচালক শুধু নির্দিষ্ট সময়ের গল্প বলেননি, বরং অতীত ও ভবিষ্যতের মানবসভ্যতার সুতোয় সুতোয় গাঁথা সম্পর্ক দেখাতে চেয়েছেন।
‘দ্য অডিসি’র নায়ক ওডিসিউস প্রাচীন গ্রিসের নিয়ম মেনে অচেনা অতিথিদের সম্মান করতেন। গায়ের জোরের চেয়ে দেবী অ্যাথেনার বুদ্ধিকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন। শিকার করার আগেও তিনি প্রাণীকে সতর্ক করে দিতেন। অন্যদিকে, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমারও নিজের যুগের বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে পরিচিত। তিনি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর চারপাশের দুনিয়ার নিয়মকানুন ভেঙে পড়ছে। ঠিক তেমনই ওডিসিউস ট্রোজান হর্সের কৌশল ব্যবহার করে ট্রয় জয় করলেও বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি মানুষের প্রতি বিশ্বাসের পবিত্র নিয়ম ভেঙেছেন। সামনাসামনি লড়াইকে তিনি সম্মানহীন শিকারে পরিণত করেছেন। এই সিদ্ধান্ত ব্রোঞ্জ যুগের অবসান ও অন্ধকার যুগের সূচনা করেছিল।
নোলানের ছবিতে এই চক্রাকার ইতিহাসের ধারণা স্পষ্ট। ‘ওপেনহাইমার’ চলচ্চিত্রে দেখা যায়, বোমা তৈরির পর তার নিয়ন্ত্রণ বিজ্ঞানীর হাতছাড়া হয়ে যায়। ঠিক একই ঘটনা ঘটে ওডিসিউসের ক্ষেত্রেও। উভয়েই নিজেদের সেরা বুদ্ধি প্রয়োগ করে মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দেন, কিন্তু সেই পরিবর্তনের ফলে বিশাল বোঝা কাঁধে নিতে হয়। ‘দ্য ডার্ক নাইট’ ছবির জোকারের নৌকা গেম বা ‘টেনেট’ ও ‘ইন্টারস্টেলার’-এ সময়ের জটিলতা—সবখানেই মানুষের নৈতিক চুক্তি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর প্রভাবের প্রশ্ন উঠেছে।
তবে নোলানের ‘দ্য অডিসি’ সম্পূর্ণ হতাশার গল্প নয়। চলচ্চিত্রের শেষে ওডিসিউস ও পেনেলোপ তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া দুনিয়া নিয়ে কথা বললেও তারা বিশ্বাস করে যে আগামীকাল আবার সূর্য উঠবে। নতুন যুগ হয়তো মানবজাতিকে আরেকবার নিজেদের বাঁচানোর সুযোগ এনে দেবে। এই বার্তাই নোলানের চলচ্চিত্রের মূল সুর—পুরোনো যুগের পতনের মধ্য দিয়েই নতুনের উন্মোচন।




