রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসলামপন্থী দলগুলোর জোট সমীকরণে নতুন মোড় দেখা দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। খেলাফত মজলিস সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে যে তারা এই জোটের কোনো কর্মসূচিতে আর অংশ নেবে না। এর আগে একই পথে হেঁটেছে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। অন্যদিকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ধারার সাতটি দলকে একত্র করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমিরের সভাপতিত্বে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অংশ নেয়। হেফাজত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে বিভেদ কমিয়ে ভবিষ্যতে একসঙ্গে চলার ব্যাপারে নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে। প্রতিটি দলের কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে এসব প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর সেগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা বলছেন, এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি। বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার জানান, এখন পর্যন্ত ১১-দলীয় ঐক্য ছেড়ে যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সাত দলের ঐক্যের বিষয়টিও এখনো চূড়ান্ত নয়। দলগুলো প্রস্তাব দেওয়ার পর পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ১১-দলীয় ঐক্যের মূল এজেন্ডা হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, যা নিয়ে আন্দোলন জোরদার করতে হবে। হেফাজতের উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি জানান, এটি মূলত ধর্মীয় বিষয়ে বোঝাপড়ার জন্য, রাজনৈতিক ঐক্য সেখানে নেই।

জোটে ফাটল ধরার পেছনে কারণগুলো স্পষ্ট। খেলাফত মজলিসের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে অসন্তুষ্ট ছিলেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা ও সংরক্ষিত নারী আসনে প্রত্যাশিত ছাড় না পাওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। একইসঙ্গে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে অংশ নিতে পারে—এমন ধারণা তাদের অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দেয়। খেলাফত মজলিস চায়, স্থানীয় নির্বাচনেও জোটগত সমন্বয় থাকুক। এই প্রেক্ষাপটে গত শনিবার কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার তৃতীয় সাধারণ অধিবেশনে ১১-দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী জানান, এখন থেকে তারা এককভাবে কর্মসূচি দেবে। তবে ভবিষ্যতে দেশ, জাতি ও ইসলামের জন্য প্রয়োজন হলে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও গত জুনে একই পথ বেছে নেয়। দলীয় সূত্র বলছে, সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা না হওয়া এবং উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই তারা এ সিদ্ধান্ত নেয়। তবে দলটির আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী জানান, নতুন কোনো ঐক্য হলে এবং তা হেফাজতের জ্যেষ্ঠ আলেমদের তত্ত্বাবধানে থাকলে তারাও তাতে অংশ নেবেন।

এদিকে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা এসব ঘটনাকে সরকারি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক পন্থায় মোকাবিলা করতে না পেরে সরকার ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটছে এবং পেছন থেকে ইন্ধন দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আন্দোলন আরও বেগবান হবে।

হেফাজতে ইসলামের নেতাদের মধ্যেও এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত তিনজন নেতা মনে করেন, উদ্যোগটি প্রশংসনীয় হলেও অতীতেও নানা উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়নি। নেতৃত্ব, রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং বিভিন্ন দলের ভিন্ন অবস্থানের কারণে এবারও এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ১১-দলীয় ঐক্য এখন নতুন বাস্তবতার মুখে। হেফাজতের উদ্যোগ নতুন রাজনৈতিক জোটে রূপ নেবে কি না, তা আগামী কিছু দিনের ঘটনাপ্রবাহেই স্পষ্ট হবে।