নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে এক বাকপ্রতিবন্ধী নারীকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার পাঁচজনকে তিন দিন করে রিমান্ডে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রোববার দুপুরে নরসিংদী আদালতে রিমান্ড শুনানি শেষে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেলাল হোসেন এই আদেশ দেন। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন সাকিব মিয়া (২৩), ইলিয়াছ মিয়া (৩৫), বিল্লাল মিয়া (২৫), দ্বীন ইসলাম (২৬) ও রিফাত মিয়া (২০)। তাঁদের প্রত্যেককে তিন দিনের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা।

ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ৪ জুলাই রাত দুইটার দিকে রেলস্টেশনের একটি পরিত্যক্ত কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় ওয়াহিদা বেগম ওরফে ববি বেগমের ওপর হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। হামলাকারীরা তাঁর দীর্ঘদিনের জমানো টাকা লুট করে নেয় এবং তাঁর চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর আঘাত করে। সাত জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখান থেকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাত সোয়া একটায় তাঁর মৃত্যু হয়।

ওই নারীর আসল নাম ওয়াহিদা বেগম এবং তিনি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর পিতার নাম মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক এবং মাতার নাম মৃত আনিসা বিবি। তিনি দম্পতির বড় মেয়ে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, তাঁর আট ভাই-বোনের মধ্যে সাতজনই বাকপ্রতিবন্ধী এবং এর মধ্যে ওয়াহিদাসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় তাঁর স্বামী মারা যান এবং তাঁর গর্ভে জন্ম নেওয়া কন্যাসন্তানও জন্মের পরপরই মারা যায়। এরপর তিনি বাবার বাড়িতে থাকছিলেন। প্রায় ২২ থেকে ২৩ বছর আগে ছোট বোনের সঙ্গে ঝগড়া করে তিনি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যান। তার আগে তিনি প্রায়ই রাগ করে অন্যের বাড়ি যেতেন, কিন্তু ফিরে আসতেন। সেবার তিনি আর ফেরেননি। তিন বছর খোঁজাখুঁজির পর পরিবার হাল ছেড়ে দেয়। সম্প্রতি ফেসবুকে ভেসে বেড়ানো ছবি দেখে তাঁরাই নিশ্চিত হন যে তিনিই ওয়াহিদা বেগম।

মেথিকান্দা রেলস্টেশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই যুগ আগে এক দুপুরে ওই স্টেশনে থামা একটি ট্রেন থেকে নেমেছিলেন ওয়াহিদা বেগম। এরপর তিনি আর কোথাও যাননি। রেলস্টেশনের একটি পরিত্যক্ত কক্ষই ছিল তাঁর আশ্রয়। তিনি বিনা বেতনে প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া ও শৌচাগার পরিষ্কারের কাজ করতেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীরা তাঁকে চিনতেন। কেউ খাবার দিতেন, কেউ পাঁচ-দশ টাকা দিয়ে সহযোগিতা করতেন। সেই টাকা তিনি জমিয়ে রেখেছিলেন, যা তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

হামলা ও লুটের ঘটনায় ৬ জুলাই রাতে ভৈরব রেলওয়ে থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। ওয়াহিদা বেগম মারা যাওয়ার পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। গত বৃহস্পতিবার দিন-রাতব্যাপী যৌথ অভিযানে ভৈরব রেলওয়ে থানা-পুলিশ, নরসিংদীর র্যাব-১১ ও রেলওয়ে ডিবি অংশ নেয়। রেলস্টেশনের আশপাশ থেকে তিনজন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাঈদ আহমেদ জানান, আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হলেও বিচারক তিন দিন মঞ্জুর করেন। আজ থেকেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে।

প্রথমে ওই নারীর কোনো স্বজন না থাকায় তাঁর লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে স্থানীয় মানুষের অনুরোধে প্রশাসন, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্টেশনসংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। গত শনিবার তাঁর কবর জিয়ারত করতে আসেন দুই স্বজন। তাঁরা পরিবারের পক্ষ থেকে এসেছিলেন বলে জানা গেছে।