২০২৪ সালে একটি ডেটিং অ্যাপে আইনজীবী সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় তৃষা শর্মার। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে প্রেমে রূপ নেয় এবং দুই পরিবারের সম্মতিতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁদের বিয়ে হয়। করপোরেট পেশাজীবী, মডেল ও অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত তৃষা ২০১২ সালে 'মিস পুনে' খেতাব জিতেছিলেন। এমবিএ সম্পন্ন করে কাজের পাশাপাশি বিনোদন জগতেও নিজের অবস্থান তৈরি করছিলেন তিনি। তবে বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর জীবনের গল্প রূপ নেয় করুণ পরিণতিতে। ২০২৬ সালের ১২ মে ভোপালের শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তৃষার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তাঁকে শ্বশুরবাড়িতে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে এবং যৌতুকের চাপও দেওয়া হয়েছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তৃষা বারবার মাকে জানিয়েছিলেন তিনি ওই বাড়িতে ভালো নেই এবং তাঁকে ভোপাল থেকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। এমনকি মৃত্যুর দিন সকালে তিনি মায়ের কাছে তিন হাজার রুপি চেয়ে রাজস্থানের নাসিরাবাদের ট্রেনের টিকিটও কেটেছিলেন। তবে পরে স্বামী সমর্থ দাম্পত্য পরামর্শে যেতে রাজি হওয়ায় তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। দুজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কাকলি রায়ের সঙ্গেও দেখা করেন। চিকিৎসক সমর্থকে ধৈর্য ধরে স্ত্রীর কথা শোনার পরামর্শ দেন এবং দুজনকেই মাদক ব্যবহার বন্ধ করতে বলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য উঠে আসে। সাবেক জেলা বিচারক গিরিবালা সিং তৃষার মানসিক ও ব্যক্তিগত কিছু সমস্যা এবং চিকিৎসার কথা উল্লেখ করেন। দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই তদন্ত এগোয়। প্রথম ময়নাতদন্তের ফল নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল না তৃষার পরিবার। পরে আদালতের নির্দেশে দিল্লির এমসের মেডিক্যাল বোর্ডে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার ফলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে এবং শরীরে হামলার গুরুত্বপূর্ণ কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
মৃত্যুর দিনের সিসিটিভি ফুটেজে তৃষাকে রাত ৯টা ৪০ মিনিটে একা ছাদে উঠতে দেখা যায়। এর আগে রাত ৯টা ২০ মিনিটে তাঁর ভাবির সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ। তিনি জানিয়েছিলেন, পিঠে ব্যথার কারণে স্বামীকে ঘরে ঘুমাতে বলেছিলেন, কিন্তু সমর্থ উল্টো আক্রমণাত্মক আচরণ করেছেন। রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে তিনি তাঁর মাকে শেষ বার্তা পাঠান, 'এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।' এক মিনিট পর তিনি ছাদে ওঠেন এবং ৯টা ৪১ মিনিটে বাবাকে ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সমর্থ খুব আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন এবং তিনি ভয় পাচ্ছেন। রাত ১০টা ৫ মিনিটে তিনি মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর মা বারবার ফোন করলেও আর যোগাযোগ হয়নি। সিসিটিভিতে দেখা যায়, রাত ১০টা ২৩ মিনিটে শাশুড়ি গিরিবালা ও পরে স্বামী সমর্থ ছাদের দিকে যান। কিছুক্ষণ পর তাঁকে নিচে নামিয়ে ভোপালের এইমসে নেওয়া হয়, যেখানে রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর তৃষার পরিবার নিছক আত্মহত্যা হিসেবে ঘটনাটি মেনে নেয়নি। শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে বিচারব্যবস্থার সম্পর্ক এবং স্বামীর আইনজীবী পরিচয়কে কেন্দ্র করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ওঠে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মামলাটিতে নজর দিলে শেষ পর্যন্ত সিবিআই তদন্তের দায়িত্ব নেয়। সিবিআইয়ের অভিযোগ হত্যা নয়; বরং দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন ও নিষ্ঠুর আচরণ তৃষাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছে। ফরেনসিক মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক নির্যাতন, হতাশা ও একাকিত্বের মধ্যে ছিলেন এবং পর্যাপ্ত মানসিক সমর্থনের অভাবে তিনি চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে সমর্থ সিং ও গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে সিবিআই।
তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। তৃষার আইফোনের ফরেনসিক তথ্য বিশ্লেষণাধীন এবং বাড়ির সিসিটিভি রেকর্ডারের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পণ-সংক্রান্ত অভিযোগের দিকটিও আলাদাভাবে তদন্ত চলছে। হিন্দুস্তান টাইমস ও ইন্ডিয়া টুডের তথ্য অবলম্বনে তৈরি এই প্রতিবেদনে উঠে আসছে একটি তরুণীর সংক্ষিপ্ত সংসার জীবনের নানা দিক, যা এখন একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।




