বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ মুদ্রানীতি বোঝার সময় শুধু সুদহারের দিকে তাকিয়ে থাকেন, যা প্রায়শই ভুল ধারণা তৈরি করে। জাপান এই ভুল বোঝার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ তৈরি করেছে, যেখানে একদিকে ব্যাংক অফ জাপানের সুদহার ৩১ বছরের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে, অন্যদিকে জাপানি ইয়েন ৪০ বছরের সর্বনিম্ন মান স্পর্শ করেছে। মুদ্রানীতি আসলে অর্থ সরবরাহ নিয়ে, সুদহার নয়। জাপানের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে কম সুদহার ছিল অর্থ সরবরাহ কম থাকার লক্ষণ, তথাকথিত 'সহজ অর্থ' নয়। অতি-সহজ মুদ্রানীতির ব্যর্থতার ধারণাটি ভুল, বরং জাপানে অর্থ সরবরাহের প্রবৃদ্ধি নগণ্য ছিল, যার ফলে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ দুর্বল ও প্রায় মুদ্রাস্ফীতিহীন অবস্থা বিরাজ করছিল।
২০০০ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে জাপানের এম২ অর্থ সরবরাহের গড় বার্ষিক বৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৬ শতাংশ। এর ফলে নামমাত্র জিডিপি গড়ে বেড়েছে ০.৩ শতাংশ হারে, প্রকৃত জিডিপি ০.৮ শতাংশ ও জিডিপি ডিফ্লেটর -০.৫ শতাংশ হারে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ব্যাংক অফ জাপানের 'ফান্ড প্রভিশনিং' কৌশল কার্যকর হয়, যেখানে ব্যাংকগুলোকে শর্তসাপেক্ষে সুদমুক্ত ঋণ দেয়া হয়। এর ফলে সর্বোচ্চ সময়ে এম২ প্রবৃদ্ধি ৯.৬ শতাংশে পৌঁছে যায়, দীর্ঘ মুদ্রাস্ফীতি শেষ হয় এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৪ শতাংশ হয়। শেয়ারবাজারেও ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়, প্রকৃত জিডিপি পুনরুদ্ধার লাভ করে।
বর্তমানে সে অবস্থা আর নেই। প্রধানমন্ত্রী সানা তাকাইচি রাজস্ব ব্যয় বাড়ালেও ব্যাংক অফ জাপানের তদারকিতে অর্থ সরবরাহের প্রবৃদ্ধি ফের ২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের মহামারি-পূর্ব অবস্থার কাছাকাছি। বিশ্লেষকদের মতে, এই হারে অর্থ সরবরাহ বাড়লে নামমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি উভয়ই নিম্নমুখী হবে। ফরচুন ম্যাগাজিনের কলামে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভ হ্যাঙ্কে ও ফেলো জন গ্রিনউড যুক্তি দেখিয়েছেন যে বর্তমানে জাপানের বন্ড ইল্ডগুলি কোভিড-কালীন মুদ্রাস্ফীতির প্রতিফলন ঘটাচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত মুদ্রা সরবরাহ এখন আর সম্প্রসারণমূলক নয়। তাই জাপানের বন্ড ইল্ড যা বর্তমানে বাড়ছে, অচিরেই কমতে শুরু করবে।
গভর্নর কাজুও উয়েদা মনে করেন মজুরি বৃদ্ধি ও উচ্চ জ্বালানি মূল্য টেকসই মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করবে এবং সুদহার আরও বাড়বে। কিন্তু অর্থ সরবরাহের প্রবৃদ্ধি যদি ৫ শতাংশ বা তার বেশি না বাড়ে, তাহলে মুদ্রাস্ফীতি কমতে থাকবে এবং সুদহার ও বন্ড ইল্ডও নিম্নমুখী হবে। সুদহার ও বন্ড ইল্ড কখনোই মুদ্রানীতির সঠিক পরিমাপ নয়, বরং তারা নামমাত্র ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিফলন ঘটায়। নীতিনির্ধারকদের উচিত অর্থ সরবরাহের প্রকৃত চালকের দিকে নজর দেয়া। জাপানের দীর্ঘমেয়াদি নিম্ন মুদ্রাস্ফীতির কারণে এম২ প্রবৃদ্ধি ও নামমাত্র জিডিপির মধ্যে সময়গত ব্যবধান বেশি হওয়ায় অনেক পর্যবেক্ষক বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তবে প্রমাণ বলছে, এম২ প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে জাপানে মুদ্রাস্ফীতি আবার কমতে শুরু করবে এবং সুদহার নিয়ে বর্তমান ধারণা ভুল প্রমাণিত হতে পারে।




