জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী কনফারেন্স রুমে আজ বুধবার অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ কথা বলেন। 'বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ৫ মাস: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে আমাদের পর্যবেক্ষণ' শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন। এটি ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে গঠিত একটি নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।
ইফতেখারুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু পাহাড়ের মানুষের অধিকার বা আঞ্চলিক সমস্যা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সমঅধিকার ও জাতীয় শান্তির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাঁর মতে, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হলে বাস্তবে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অধিকার, মানুষের সমঅধিকার ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। তিনি ১৯৯৭ সালের চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সীমাভিত্তিক রোডম্যাপ প্রণয়ন এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ১৯৭১ সালে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে গণতন্ত্র, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমঅধিকারের যে অঙ্গীকার হয়েছিল, পার্বত্য চুক্তিও সেই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের জন্যই স্বাক্ষরিত হয়, লঙ্ঘনের জন্য নয়। পার্বত্য চুক্তির ক্ষেত্রেও তাদের প্রত্যাশা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা, পরিচয়ের বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি, পাহাড় ও সমতলের মানুষের সমঅধিকার এবং সম্প্রীতির মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সেখানে 'আদিবাসী' শব্দটি না থাকায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর মতে, মানুষের আত্মপরিচয় নির্ধারণের অধিকার একটি স্বীকৃত মানবাধিকার। কেউ নিজেকে আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দিতে চাইলে সেই অধিকার অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম নয়, সংঘাতের মূল কারণ ও দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসও মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করেন ইফতেখারুজ্জামান। এ ক্ষেত্রে আস্থা তৈরির উদ্যোগ এবং সামাজিক পুনর্গঠন কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা কোনো একক রাজনৈতিক দল, সরকার বা আমলাতন্ত্রের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্ষমতা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি পুনরায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এই চুক্তির মধ্যে যদি সত্যিই টেকসই শান্তি, উন্নতি বা উন্নয়ন চাওয়া হয়, তাহলে বাকি অর্ধেক বাঙালি জনগোষ্ঠীকে কীভাবে আলোচনায় যুক্ত করা যায়, সেটি বিবেচনা করা দরকার। তাঁদের বাইরে রেখে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তিনি প্রস্তাব দেন, বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটি জাতীয় কমিশন গঠন করতে পারে।
সাইফুল হক আরও বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই সরকার বলছেন তারা একটি রেইনবো নেশন বা বহুমত ও বহুত্ববাদী সমাজ গঠন করতে চান। এই বিষয়গুলোকে কেবল গবেষণার বিষয় হিসেবে না, বাস্তবে রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।
বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। সেই বঞ্চনার প্রেক্ষাপটেই পার্বত্য চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরও এর বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তিনি বলেন, পাহাড়ের মানুষের ন্যায্য দাবি নিয়ে কথা বললেই নানা অপপ্রচারের মুখে পড়তে হয়, কিন্তু এতে তাদের ন্যায়সংগত দাবি অস্বীকার করা যাবে না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে চুক্তি বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও পাঁচ মাসে এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। তাঁর অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন, যা চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা চুক্তির চেতনার পরিপন্থী।
সভায় অবিলম্বে একজন পাহাড়িকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী নিয়োগ, অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে প্রত্যাহার, চুক্তি বাস্তবায়নের সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি পুনর্গঠন, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করা এবং আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী সংলাপ শুরুর দাবি জানানো হয়। মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফি রতন।




