চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুসারে, শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে সাড়ে ১৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস। শুক্রবারও প্রায় একই পরিমাণ সরবরাহ পাওয়া গিয়েছিল। অথচ অঞ্চলের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩২ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ কম প্রায় ৪৫ শতাংশ, যা দৈনিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ১৪ কোটি ঘনফুটে।
এই স্বল্প সরবরাহের কারণে আবাসিক, শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা মনে করছেন, দৈনিক অন্তত ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে বর্তমান অবস্থাকে অনেকাংশে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। তবে সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য আরও অন্তত একদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক মো. শোয়েব প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, রোববার একটি নতুন এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) কার্গো আসার কথা রয়েছে। কার্গোটি পৌঁছালে এলএনজি থেকে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে এবং তখন সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
কেজিডিসিএলের হিসাবে, চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩২ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত পাওয়া গেছে সাড়ে ১৭ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ কম প্রায় ৪৫ শতাংশ। ঘাটতির পরিমাণ সাড়ে ১৪ কোটি ঘনফুট। প্রায় এক মাস ধরে চট্টগ্রামে গ্যাসের সংকট চলমান রয়েছে। এর মধ্যে সরবরাহ কখনো সামান্য বেড়েছে, আবার কখনো কমেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি আবার অবনতির দিকে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে সব খাতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন খাতে গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। দৈনিক সরবরাহ ২৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হলে আবাসিকসহ অন্যান্য খাতের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে।
গ্যাসের এই ঘাটতির প্রভাব শিল্পকারখানাতেও পড়ছে। পর্যাপ্ত চাপের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন ধরে রাখতে কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ডিজেল ও ফার্নেস তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হয়েছে। ফলে তাদের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহের বড় অংশই নির্ভর করে মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর। স্বাভাবিক সময়ে দুটি টার্মিনাল থেকে মিলিয়ে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে। এরপর টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামে। বাসাবাড়িতে চুলা বন্ধ হয়ে যায়, সিএনজি ফিলিং স্টেশনে তৈরি হয় দীর্ঘ সারি। শিল্পকারখানাতেও গ্যাসের চাপ কমে যায়। এরপর প্রায় ২৫ দিন সরবরাহে বড় ঘাটতি ছিল। ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পুরোদমে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। চট্টগ্রামেও সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু নতুন এলএনজি কার্গো না থাকায় এক্সিলারেটের টার্মিনালে মজুত কমতে থাকে। এর সঙ্গে কমানো হয় গ্যাস সরবরাহও। একপর্যায়ে গত বুধবার বেলা তিনটার দিকে টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় পর্যায়েও গ্যাসের ঘাটতি আবার বেড়েছে।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২২২ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১৫৮ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতির প্রভাব চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পড়ছে। তবে আগামীকাল নতুন এলএনজি কার্গো পৌঁছালে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির দুই কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, নতুন কার্গো এলে এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে এবং চট্টগ্রামেও অবস্থার উন্নতি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কার্গো বিলম্বিত হলে ঘাটতির এই অবস্থা আরও কিছুদিন টিকে থাকতে পারে।




