গত এক শতকে ইউরোপীয়রা এমন অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হয়নি। তীব্র তাপমাত্রার কারণে নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছে, আর এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন আবহাওয়াবিদ ও রাজনীতিবিদরা। উত্তর আফ্রিকা থেকে প্রবেশ করা উষ্ণ বায়ু ও শক্তিশালী উচ্চচাপের 'ওমেগা ব্লক' এর কারণে ইউরোপের বড় অংশজুড়ে এই তাপদাহ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বায়ুর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এই ব্লক উষ্ণতাকে আটকে রেখেছে। উষ্ণ ভূমধ্যসাগর ও শুষ্ক মাটিও তাপমাত্রা বাড়িয়ে তুলছে।
জুনের মাঝামাঝি থেকে স্পেন ও পর্তুগাল হয়ে ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, যুক্তরাজ্যসহ মধ্য ইউরোপে একটি বিশাল উচ্চচাপ বলয় প্রভাব ফেলেছে। জার্মানির বহু অঞ্চলে গতকাল (১৫ আগস্ট) তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। এর আগে ২৮ জুন জার্মানির বিস্তীর্ণ এলাকায় ৩৯ থেকে ৪২ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। ফলে পশ্চিম ইউরোপে এই তাপপ্রবাহ প্রায় তিন সপ্তাহ এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে প্রায় দুই সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, এবারের তাপপ্রবাহে ইউরোপে ১৫ কোটির বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো ও শ্রম উৎপাদনশীলতার ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। সংস্থাটি তাপপ্রবাহের কারণে ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করছে। অন্যদিকে, জার্মানির রবার্ট কখ ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত জার্মানিতে প্রচণ্ড গরমে সাড়ে ১২ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
তবে জার্মানির আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন তাপপ্রবাহের পর আবারও আবহাওয়ার পরিবর্তন শুরু হতে পারে। তাপমাত্রা কমে সর্বোচ্চ ২২ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে জার্মানির অনেক অঞ্চলে বন দাবানলের ঝুঁকি এখনো অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ছাড়া প্রায় সব এলাকাতেই এই ঝুঁকি বিরাজ করছে।
জার্মানির পশ্চিমাঞ্চল আইফেলের হুর্টগেনভাল্ডে সৃষ্ট দাবানল এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নতুন করে আগুন ছড়িয়ে না পড়লেও প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন জরুরি উদ্ধারকর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছেন। এই অঞ্চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ থাকায় আগুন নেভানোর কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ১৯৪৪ ও ১৯৪৫ সালে হুর্টগেনভাল্ড ছিল জার্মান ও মার্কিন সেনাদের মধ্যে তীব্র যুদ্ধের প্রধান ক্ষেত্র, যেখানে প্রায় ২৫ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছিল। গত শুক্রবার ওই এলাকা থেকে বেশ কিছু বিস্ফোরক ও যুদ্ধাস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
দাবানলের কারণে হুর্টগেনভাল্ডের আশপাশ থেকে ১৮০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জার্মান সেনাবাহিনীর ১০টি হেলিকপ্টার উদ্ধার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, গত শুক্রবারের মতো আবারও অগ্নিনির্বাপক হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক রালফ নোল্টেন ভিডিআর টেলিভিশনকে জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতটি মোটামুটি ভালোভাবে কেটেছে, বাতাসের গতি কমেছে এবং আগুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েনি। তবে উত্তর দিক থেকে বাতাস বইতে শুরু করায় পরিস্থিতির ওপর কী প্রভাব পড়বে তা স্পষ্ট নয়। এই দাবানলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ হেক্টর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জার্মান ফরেস্ট্রি কাউন্সিলের সভাপতি ক্রিশ্চিয়ান হাসে ভিডিআর টেলিভিশনকে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে জার্মানিতে দাবানল আরও ঘন ঘন ঘটবে—এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। সেইসঙ্গে আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎস আইফেল অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন। ড্যুরেন জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, মেরৎস টেলিফোনে জেলা প্রশাসক নোল্টেনের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং উদ্ধারকর্মী ও সহায়তাকারীদের বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়েছেন।




