দুই বছর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন—এই দাবিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক হারে ছড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও। এর মধ্যে কিছু ভিডিওতে তাঁর দেশে ফেরার পক্ষে স্লোগান দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, এই ভিডিওগুলোর বেশিরভাগই পুরোনো এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তৈরি, যা বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে নতুন করে প্রচার করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া একটি ২১ সেকেন্ডের ভিডিওতে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, 'আপা আসবে, খুব শিগগিরই আপা আসবে, ধৈর্য ধর, আপা আসছে।' পাশে দাঁড়ানো অপর একজন পুলিশ পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, 'ডিসেম্বর মাসে চলে আসবে আপা।' এরপর প্রথম ব্যক্তি আরও জোর দিয়ে বলেন, 'ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যেই আসবে। আমরা তাকে যে পরিমাণ সাপোর্ট দেওয়া দরকার, আমরা কিন্তু ঠিকই দেব তাকে। আপাকে আমরা নিয়ে আসব।' তথ্য যাচাইয়ে জানা গেছে, ভিডিওতে দেখা যাওয়া ব্যক্তিরা প্রকৃত পুলিশ সদস্য নন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত একটি পারফর্মিং আর্টের অংশ হিসেবে এ দৃশ্যটি তৈরি করা হয়েছিল। ভিডিওটির কি-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে 'Shironam24' নামের একটি সংবাদভিত্তিক ফেসবুক পেজে গত ৫ আগস্ট 'আপা আসবে শিগগিরই: প্রতীকী পুলিশ' ক্যাপশনে প্রকাশিত মূল ভিডিওটির সঙ্গে হুবহু মিল পাওয়া যায়।

শেখ হাসিনার পক্ষে রিকশাচালকদের স্লোগান দেওয়ার দাবিতে আরেকটি ১১ সেকেন্ডের ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে। 'মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্য রিকশাশ্রমিক ভাইরা জেগে উঠেছে'—এই ক্যাপশনে ছড়ানো ভিডিওটি যে শেখ হাসিনার পক্ষে নয়, তা যাচাইয়ে বেরিয়ে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে এটি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার পুরোনো ভিডিও। ওই সময় ফেসবুকের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ভিডিওতে 'জেগেছে রে জেগেছে, রিকশাওয়ালা জেগেছে', 'আমার ভাইয়ের বুকে গুলি কেন, শেখ হাসিনা জবাব দে', 'বোনের বুকে গুলি কেন, শেখ হাসিনা জবাব দে'—এই ধরনের স্লোগান শোনা যায়। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রিকশাচালকদের অংশ নিয়ে স্লোগান দেওয়ার ঘটনা মূলধারার গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল।

'ঢাকার রাজপথে আজ আলেম সমাজ ও সাধারণ মানুষ এক হয়ে দাঁড়িয়েছে, রক্তের বিনিময়ে হলেও শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে'—এই দাবিতে ছড়ানো ১৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিওও সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার কোনো মিছিলের দৃশ্য নয়। বরং ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি প্রদান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিতে আয়োজিত একটি বিক্ষোভ মিছিলের ভিডিও। ওই মিছিলের ঘটনা পরদিন মূলধারার গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল।

গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারতের ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (এফসিসি) আয়োজিত ভার্চ্যুয়াল মতবিনিময়ে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর 'ঢাকা উত্তাল' দাবিতে আরেকটি ভিডিও ছড়ানো হয়। ফ্যাক্ট-চেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এই ভিডিওটি ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। গত ১ জুন ধানমন্ডিতে সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের প্রথম জানাজা শেষে 'জয় বাংলা' স্লোগান দেওয়ার দৃশ্যকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে। তোফায়েল আহমেদের জানাজায় এ ঘটনার ভিডিওচিত্র তখন বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রকাশ করেছিল।

'আজকে যশোর–বেনাপোল সীমান্ত থেকে দেশকে দেখে গেলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা'—এই দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটিও পুরোনো এবং স্থানটিও ভুল। প্রকৃতপক্ষে ২০২৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার জনসভা শেষে টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার পথে নৌকাবাইচ দেখতে গাড়ি থেকে নামার দৃশ্য এটি। ওই সময়ের একাধিক প্রতিবেদনে এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।