নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘এনোলা হোমস’-এর তৃতীয় কিস্তি গত ১ জুলাই প্ল্যাটফর্মটিতে মুক্তি পায়। ন্যান্সি স্প্রিঙ্গারের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিরিজটি প্রথম থেকেই দর্শকদের মন জয় করে এসেছে। মুক্তির প্রথম পাঁচ দিনেই ছবিটি প্রায় দুই কোটি ভিউ অর্জন করে নেটফ্লিক্সের গ্লোবাল টপ চার্টের শীর্ষে ওঠে আসে। দুই সপ্তাহ পরও সিনেমাটি শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে, যেখানে বাংলাদেশের দর্শকরাও প্ল্যাটফর্মটির শীর্ষ পাঁচে সিনেমাটি দেখছেন।
কাহিনির শুরুতে দেখা যায়, এনোলা হোমস (মিলি ববি ব্রাউন) জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। লর্ড টুক্সব্রিকে (লুই পারট্রিজ) বিয়ে করতে যাচ্ছে সে, কিন্তু বিয়ের আগেই তার মনে প্রশ্ন জাগে—বিয়ে কি তার স্বাধীন পরিচয় বদলে দেবে? এই ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান শার্লক হোমস (হেনরি ক্যাভিল)। বিয়ের অনুষ্ঠান ছেড়ে ভাইকে খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নেয় এনোলা। পথে তার সঙ্গী হয় ড. জন ওয়াটসন (হিমেশ প্যাটেল) এবং পরে যোগ দেন এনোলার মা ইউডোরিয়া হোমস (হেলেনা বোনহ্যাম কার্টার)। তদন্ত এগোতে থাকলে বোঝা যায়, এটি কেবল একজনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরোনো শত্রুতা, গোপন ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্ধকার ইতিহাস।
প্রথম সিনেমায় এনোলা শার্লকের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার গল্প দেখানো হয়। দ্বিতীয় কিস্তিতে সে নিজের ডিটেকটিভ এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করে একজন স্বনির্ভর গোয়েন্দা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তৃতীয় পর্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এনোলার চরিত্রকে আরও পরিণতভাবে উপস্থাপন করা। পরিচালক ফিলিপ বারান্তিনি সেই পথেই হাঁটার চেষ্টা করেছেন, তবে সব ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি সফল হয়নি।
অভিনয়ের দিক থেকে মিলি ববি ব্রাউন আবারও প্রমাণ করেছেন যে তিনিই এনোলা চরিত্রের জন্য সেরা পছন্দ। প্রথম ছবির কৌতূহলী কিশোরী থেকে তৃতীয় ছবির আত্মবিশ্বাসী ও পরিণত গোয়েন্দা—এই পরিবর্তন তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দর্শকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পরিচিত ভঙ্গিটি এবার শুধু হাস্যরসের জন্য নয়, বরং চরিত্রটির ভেতরের দ্বন্দ্ব ও আবেগ প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
শার্লক হোমস চরিত্রে হেনরি ক্যাভিল ক্যারিশম্যাটিক হলেও এবার তার উপস্থিতি ছিল নামমাত্র। প্রথম দুটি ছবিতে ভাই-বোনের রসায়ন সিরিজটির অন্যতম বড় সম্পদ ছিল, যা এই পর্বে অনুপস্থিত থাকায় তা টের পাওয়া যায়। লর্ড টুক্সব্রি চরিত্রে লুই পারট্রিজ আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও চরিত্রটির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। অন্যদিকে ইউডোরিয়া হোমস (হেলেনা বোনহ্যাম কার্টার) পর্দায় এলেই ছবিতে প্রাণ ফিরে আসে। এবারও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি। ড. ওয়াটসন চরিত্রে হিমেশ প্যাটেল তদন্তের অগ্রগতিতে কার্যকর সঙ্গী হয়ে ওঠেন। মরিয়ার্টি চরিত্রে শ্যারন ডানকান-ব্রুস্টারের উপস্থিতি যথেষ্ট দৃঢ় হলেও চিত্রনাট্যের সীমাবদ্ধতায় চরিত্রটির গভীরতা পুরোপুরি বিকশিত হয় না।
পরিচালক ফিলিপ বারান্তিনি, যিনি আগের দুটি ছবির পরিচালক হ্যারি ব্র্যাডবিয়ারের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন, তিনি ছবিটিতে আরও পরিণত ভিজ্যুয়াল ভাষা প্রয়োগ করেছেন। মাল্টার মনোরম লোকেশন, ভিক্টোরিয়ান যুগের সেট ডিজাইন ও পোশাক পরিকল্পনা ছবিটির অন্যতম বড় সম্পদ। সিনেমাটোগ্রাফি ও প্রোডাকশন ডিজাইন পুরো পরিবেশকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে, যদিও মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত ফ্ল্যাশব্যাক কিছুটা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।
তবে ছবির সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো রহস্য নির্মাণ। ‘শার্লক হোমস’ জগতের গল্পে দর্শক যেখানে সূক্ষ্ম সূত্র আর চমকে ভরা তদন্তের প্রত্যাশা করেন, সেখানে এ ছবি রহস্যের চেয়ে অ্যাডভেঞ্চারকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। একদিকে জটিল ষড়যন্ত্রের আভাস দেওয়া হলেও অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলো এত সহজে সামনে আসে যে দর্শকের নিজের মতো করে ধাঁধা মেলানোর সুযোগ কমে যায়। ফলে রহস্যের সমাধান সন্তোষজনক হলেও, সেটি প্রত্যাশিত বুদ্ধিবৃত্তিক তৃপ্তি এনে দিতে পারে না। এমনকি মরিয়ার্টিকে ঘিরে যে মানসিক টানাপোড়েন বা বুদ্ধির লড়াই প্রত্যাশিত ছিল, সেটিও পুরোপুরি বিকশিত হয় না। অ্যাকশন দৃশ্যগুলো মন্দ নয়, তবে মনে রাখার মতোও নয়। ক্লাইম্যাক্সে নাটকীয়তা থাকলেও রহস্যের সমাধান প্রত্যাশিত মাত্রার উত্তেজনা তৈরি করতে পারে না।
তবে ছবির সাবলীল গতি ও চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়। দীর্ঘ শট, সাবলীল ক্যামেরা মুভমেন্ট আর দ্রুত সম্পাদনা ছবিটিকে প্রাণবন্ত রেখেছে। পরিচালক আগের ছবিগুলোর হালকা, প্রাণখোলা মেজাজ অক্ষুণ্ন রেখেছেন। ফলে এটি একদিকে তরুণদের জন্য রোমাঞ্চকর অভিযান, অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের জন্যও আবেগময় এক যাত্রা।
সবমিলিয়ে ‘এনোলা হোমস ৩’ প্রথম দুটি ছবির জাদু পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারেনি, কিন্তু পারিবারিক রহস্য-অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে বেশ উপভোগ্য। যাঁরা এ ফ্র্যাঞ্চাইজির ভক্ত, তাঁরা পরিচিত চরিত্রগুলোর নতুন অভিযানে হতাশ হবেন না। তবে যাঁরা আরও জটিল রহস্য বা শক্তিশালী গোয়েন্দা গল্প চান, তাঁদের কাছে কিছুটা ম্লান লাগতে পারে।


