নিউইয়র্কের কুইন্স ভিলেজে বাস করছেন সুরকার ও সংগীত পরিচালক ইবরার টিপু এবং তাঁর স্ত্রী সংগীতশিল্পী বিন্দুকণা। তাঁদের বড় মেয়ে অর্নির বয়স আট বছর হতে চলেছে। সম্প্রতি গাড়ি চালিয়ে স্কুল থেকে মেয়েকে আনার সময় স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলেন টিপু। কফিশপে থেমে তিনি বলেন, ‘ওপরে আল্লাহ আর পাশে বিন্দুকণা ছিল বলেই আজ কথা বলতে পারছি।’ তাঁর কথায় ফুটে ওঠে কৃতজ্ঞতা আর দুঃসহ স্মৃতি।

২০২৪ সালের শেষ দিকে পেটে অস্বস্তি ও পিঠে ব্যথা শুরু হয় টিপুর। স্ত্রীর অনুরোধ সত্ত্বেও প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। দেশে থাকাকালীন প্রতি বছর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালেও কখনো বড় সমস্যা ধরা পড়েনি। কিন্তু ২০২৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে পারেন, তিনি অ্যাডভান্স স্টেজের কিডনি ক্যানসারে আক্রান্ত। শুনে হতবাক হয়ে যান টিপু।

সেই সময় বিন্দুকণা সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বড় মেয়ে অর্নির বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। প্রবাসে সব কাজ নিজেরাই সামলাতে হয়। তাই প্রথমে স্ত্রী ও সন্তানের কথা ভেবে ক্যানসারের বিষয়টি গোপন রাখেন টিপু। কিন্তু আর লুকানো সম্ভব হয়নি। বিন্দুকণা বলেন, ‘চিকিৎসক সরাসরি বলে দিলেন, টিপুর বাঁচার সম্ভাবনা কম। কথাটা শোনার পর আমি দাঁড়াতে পারিনি। মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলাম।’ চিকিৎসকেরা জানান, এই পড়ে যাওয়ার কারণে গর্ভের সন্তানের বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারত।

এরপর শুরু হয় অনিশ্চিত যুদ্ধ। বিন্দুকণা সন্তান পেটে নিয়েই স্বামীকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটেছেন। শেষ পর্যন্ত একজন চায়নিজ চিকিৎসকের সন্ধান পান। তাঁর তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে। ২০২৫ সালের মার্চে সিদ্ধান্ত হয়, অস্ত্রোপচারের আগে কেমোথেরাপি শুরু হবে। ২৬ মার্চ নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের কলম্বিয়া হাসপাতালে শুরু হয় টিপুর কেমোথেরাপি। টানা তিন দিন চিকিৎসা চলে। কিন্তু ঠিক একই সময় ফ্লাশিংয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন অন্তঃসত্ত্বা বিন্দুকণা। একদিকে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই, অন্যদিকে প্রসবের অপেক্ষা। একই শহরের দুই হাসপাতালে চলছিল দুই ধরনের যুদ্ধ। বিন্দুকণার ভাষায়, ‘সেই সময়টা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না।’

তিন দিনের কেমোথেরাপি শেষে টিপু বাসায় ফেরেন। একই দিন নবজাতক নিয়ে হাসপাতাল থেকে ফেরেন বিন্দুকণা। কিন্তু বাসায় ঢুকেই দেখেন, টিপু সোফায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। কাউকে চিনতে পারছে না। তিন দিনের নবজাতককে নিয়ে বাসায় ফিরে এমন দৃশ্য দেখে দিশাহারা হয়ে যান তিনি। দ্রুত ৯১১-এ ফোন দেন। পরে অ্যাম্বুলেন্স টিপুকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

কেমোথেরাপি শুরু হওয়ার সময় টিপুর ওজন ছিল ৭৬ কেজি। কিন্তু চিকিৎসার ধকল তাঁকে ভেঙে দেয়। হাসপাতালে টানা ১৮ দিন ভর্তি থাকার সময় ওজন কমে যায় প্রায় ২৫ কেজি। নেমে আসে ৫১ কেজিতে। বিন্দুকণা জানান, ‘ওই সময় পর্যন্ত সে আমাদের ছোট মেয়ের মুখও দেখেনি। মাসখানেক পর প্রথমবারের মতো মেয়েকে কোলে নেয়।’ পাঁচ মাস ধরে কেমোথেরাপি চলেছে। পাশাপাশি ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি ও প্রোটন থেরাপিও নিতে হয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১১ ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচার হয় টিপুর। এর ঠিক এক মাস পর, ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে ফুসফুসের টিউমার অপসারণে আরেকটি সাত ঘণ্টার অস্ত্রোপচার করা হয়। পুরো সময়টায় বিন্দুকণার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল একাকিত্ব। তিনি বলেন, ‘নতুন দেশ। কাউকে সেভাবে চিনি না। যার ওপর ভরসা করে এসেছি, সেই মানুষটাই কঠিন রোগে আক্রান্ত। দুই সন্তান নিয়ে কী করব—কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শুধু আল্লাহকে বলতাম, আমাকে বাঁচিয়ে রেখো, যেন আমার মানুষটার পাশে থাকতে পারি।’

কঠিন সময়ে কিছু মানুষের আচরণ টিপু ও তাঁর পরিবারকে কষ্ট দিয়েছে। টিপু বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের পরিচিত অনেক মানুষ আছেন। সহযোগিতা তো দূরের কথা, কেউ একবারের জন্যও দেখতে আসেনি। বাংলাদেশ থেকে যেসব শিল্পীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল, তারাও দেখা করেনি। এখন এসব নিয়ে আর ভাবি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন এই রোগ কাউকে না দেন। একদিকে আমি হাসপাতালে কেমোথেরাপি নিচ্ছি, অন্যদিকে আরেক হাসপাতালে অন্তঃসত্ত্বা কণা ভর্তি। আমি চাইলেও তার পাশে থাকতে পারিনি। আবার বাসায় আমাদের ছোট্ট মেয়েটা একা ছিল। কীভাবে সময়টা কেটেছে, তা শুধু আল্লাহ জানেন।’

দীর্ঘ লড়াইয়ের পর এখন সুস্থতার পথে টিপু। তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। ধীরে ধীরে ওজন বাড়ছে। খেতে পারছি। বাসার স্টুডিওতে কাজ করি। গাড়ি চালিয়ে পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে যাই।’