ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বিশ্বকাপে রেফারি হওয়া মানেই বিপুল চাপ ও দায়িত্ব। এই পেশায় সফল হতে হলে শুধুমাত্র খেলার নিয়মকানুন জানাই যথেষ্ট নয়, বরং শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত শক্ত হতে হয়। ফিফার তত্ত্বাবধানে বিশ্বকাপের জন্য রেফারি নির্বাচন প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। স্থানীয় বা জেলা পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় লিগে ধারাবাহিক সাফল্য দেখানোর পর ফিফা আন্তর্জাতিক তালিকায় নাম উঠতে পারে একজন রেফারির। এরপর মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা যেমন উয়েফা, কোপা বা এএফসি আসর পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। সব শেষে ফিফা রেফারি কমিটি বিশ্বকাপের জন্য চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে, যেখানে জায়গা পাওয়া মানেই ক্যারিয়ারের শীর্ষে পৌঁছে যাওয়া।
নির্বাচিত হওয়ার পরও রেফারিদের প্রায় এক থেকে দুই বছর বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হয়। ফিটনেস পরীক্ষায় স্প্রিন্ট, সহনশীলতা ও উচ্চগতির দৌড়ের মতো কঠিন ধাপ পেরোতে হয়। একজন রেফারি ম্যাচপ্রতি ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়ান, যা একজন মিডফিল্ডারের সমান। তাছাড়া ভিএআর প্রশিক্ষণ ও কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করা হয়। মাঠে রেফারির কাজ শুধু ফাউল ও কার্ড দেখানো নয়; ম্যাচের সময় নিয়ন্ত্রণ, ইনজুরি টাইম যোগ করা, এবং ভিএআরের পরামর্শ মূল্যায়ন করাও তার দায়িত্ব। ফুটবলের আইন অনুযায়ী, মাঠে রেফারির সিদ্ধান্তই সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত।
সম্প্রতি বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যে একটি ঘটনা আবার রেফারি প্রসঙ্গকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। সেই ম্যাচের প্রধান রেফারি ফ্রান্সের ফ্রঁসোয়া লেতেক্সিয়ে ভিএআরের সহায়তায় একটি গোল বাতিল করেন। মিসরের কোচ হোসাম হাসান অভিযোগ করেন, রেফারির সিদ্ধান্তই আর্জেন্টিনাকে জয় এনে দিয়েছে। তবে ফিফার নির্দেশনা অনুযায়ী রেফারির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হয়।
পারিশ্রমিকের বিষয়টি বেশ চমকপ্রদ। ফিফার প্রকাশিত তথ্যমতে, একজন প্রধান রেফারি টুর্নামেন্ট ফি বাবদ ৫০ থেকে ৭০ হাজার মার্কিন ডলার পান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০ থেকে ৮৫ লাখ টাকা। এর বাইরে প্রতিটি ম্যাচের জন্য আলাদাভাবে ৩ থেকে ৫ হাজার ডলার (সাড়ে ৩ থেকে ৬ লাখ টাকা) দেওয়া হয়। ফলে পুরো আসর শেষে একজন প্রধান রেফারির আয় ১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। সহকারী রেফারিদের টুর্নামেন্ট ফি ২৫ থেকে ৩৫ হাজার ডলার (৩০-৪২ লাখ টাকা), এবং ম্যাচপ্রতি তারা পান ২ থেকে ৩ হাজার ডলার (আড়াই থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা)। এ ছাড়া ভ্রমণ, আবাসন ও অন্যান্য ভাতার পুরো ব্যয়ভার বহন করে ফিফা। বর্তমানে বিশ্বকাপে মাঠের বাইরে ভিএআর দলের উপস্থিতি বেড়েছে, যেখানে ভিডিও সহকারী রেফারি, অফসাইড বিশেষজ্ঞ ও রিপ্লে অপারেটররা কাজ করেন।
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত রেফারি হিসেবে ইতালির পিয়েরলুইজি কোলিনার নাম উল্লেখযোগ্য। টাকমাথা আর তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই রেফারি ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনা করে স্মরণীয় হয়েছেন। বর্তমানে তিনি ফিফার রেফারিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রেফারি হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহীদের জন্য বিশ্বকাপ রেফারির পথ ও পারিশ্রমিক নিঃসন্দেহে একটি আকর্ষণীয় দিক।




