যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় অংশ নেওয়া ইরানি প্রতিনিধিদলকে প্রতিটি মুহূর্তে প্রাণহানির শঙ্কা নিয়ে কাজ করতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তাঁর নেতৃত্বেই বর্তমানে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরসনে আলোচনা চলছে। সম্প্রতি মেহর নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে এক কথোপকথনে তিনি এ উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
আরাগচি বলেন, ‘আমি উইটকফকে বলেছিলাম, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল থেকে আসা হুমকি তেহরানের আলোচকদের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।’ ওই কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘আমি উইটকফকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি কি কখনো এমন কোনো বৈঠকে অংশ নিয়েছেন, যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড মনে হয়েছে, যেকোনো সময় পুরো বৈঠকটি বোমা হামলার শিকার হতে পারে? ফোনে কথা বলার সময় কি আপনার মনে হয়েছে, আপনি যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত বা ধ্বংস হয়ে যেতে পারেন, যেমনটা তারা বলে থাকে? পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় কি কখনো আপনার মনে হয়েছে, এটিই হয়তো শেষবারের মতো কথা?’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ক্রমাগত হুমকি সত্ত্বেও তেহরান পিছু হটতে রাজি হয়নি। তিনি জানান, ‘শূন্য মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অবৈধ ও অযৌক্তিক দাবির জবাবে আমরা দৃঢ় অবস্থান নিয়েছি এবং প্রতিরোধ জানিয়েছি। যখন তারা বুঝতে পারল যে আলোচনার মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়, তখন তারা যুদ্ধ শুরু করে দেয়।’ আরাগচি দাবি করেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র প্রথম পারমাণবিক বিষয়ে আলোচনার জন্য তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই এ যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। আলোচনার টেবিলে তেহরানের দৃঢ় অবস্থানই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আরও কঠোর পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে আরাগচি বলেন, ‘আপনাদের আলোচনা করতে হবে। আমাদের হুমকি দেওয়া যাবে না, আর ঘুষ বা প্রলোভন দিয়েও আমাদের প্রভাবিত করা সম্ভব নয়।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, তারা ১২ দিনের যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ইরানকে ভয় দেখাতে পারেনি। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অর্থহীন’ সরাসরি আলোচনা নাকচ করে দিয়েছেন তিনি।
‘ইরান ভেনেজুয়েলা নয়’—এ কথা উল্লেখ করে আরাগচি সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে নতিস্বীকারে বাধ্য করার ওয়াশিংটনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। গত জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করে সরকার পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটি ভেনেজুয়েলা নয় যে একজনকে ধরে নিয়ে গেলে বাকিরা ভয়ে পিছু হটে যাবে।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, তেহরানের ক্ষমতাকাঠামোতে একক নেতৃত্বের ব্যবস্থা নেই, বরং বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে নেওয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বিদ্যমান। তাই একজন নেতাকে সরিয়ে দিলেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। আজ সোমবার টানা নবম দিনের মতো মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে। নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের তিন সেনা নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে।




