২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে সার্বিক পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। এই ফলাফলের মাধ্যমে একদিকে যেমন বহু শিক্ষার্থী কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পথে এগিয়েছে, তেমনি অনেক শিক্ষার্থী অনুত্তীর্ণ থেকেছে, যাদের জন্য রয়েছে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের এখন সামনে একাধিক শিক্ষাপথ খোলা আছে—একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি, কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা বা অন্যান্য দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ। তবে সঠিক পথ বেছে নিতে হলে নিজের ফলাফল, আগ্রহ, যোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করা জরুরি। এবারের ফলাফলে যেখানে অনেক শিক্ষার্থী সাফল্য পেয়েছে, সেখানে কিছু প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি—যা ওই সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষক সংকট ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে জিপিএ–৫ পাওয়াদের সাফল্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় তাদের মেধা ও পরিশ্রমের প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

এসএসসির পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এখন কোথায় ভর্তি হবে? কেউ কলেজে একাদশ শ্রেণিতে যেতে চায়, কেউ পলিটেকনিকে ডিপ্লোমা করতে আগ্রহী, আবার কেউ স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি বা মাদ্রাসা শিক্ষার পথ বেছে নিতে চায়। সবার জন্য একই পথ সঠিক নয়। শিক্ষার্থীর আগ্রহ, দক্ষতা, ফলাফল, পারিবারিক আর্থিক সামর্থ্য এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য—সবকিছু মিলিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ভর্তি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে নাম লেখানো নয়; এটি নিজের ভবিষ্যৎ গঠনের প্রথম বড় সিদ্ধান্ত। তাই ‘কোন প্রতিষ্ঠান ভালো’—এ প্রশ্নের পাশাপাশি ‘আমি কী হতে চাই, কী ধরনের কাজ করতে চাই এবং কোন শিক্ষাপথে সেটি সম্ভব’—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

একাদশ শ্রেণি বা এইচএসসি উত্তীর্ণদের একটি বড় অংশ কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে দুই বছরের এইচএসসি সম্পন্ন করে। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, প্রকৌশল বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সরকারি–বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য এইচএসসি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কলেজে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক—এই তিন বিভাগে পড়ার সুযোগ থাকে। বিজ্ঞান বিভাগ তাদের জন্য যাদের গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান বা তথ্যপ্রযুক্তিতে আগ্রহ রয়েছে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ হিসাববিজ্ঞান, ব্যাংকিং, ব্যবস্থাপনা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন বা বাণিজ্যভিত্তিক পেশায় আগ্রহীদের জন্য সহায়ক। আর মানবিক বিভাগ আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, উন্নয়ন অধ্যয়ন বা প্রশাসনমুখী উচ্চশিক্ষার ভিত তৈরি করতে পারে। একাদশে ভর্তির সময় শুধু নামী প্রতিষ্ঠানের পেছনে না ছুটে যাতায়াত, শিক্ষার পরিবেশ, নিয়মিত ক্লাস, শিক্ষক সংকট, ফলাফলের ধারা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সাধারণত অনলাইন প্রক্রিয়ায় ভর্তি সম্পন্ন হয়; তাই শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞপ্তি থেকে নির্ধারিত সময়সূচি ও নীতিমালা যাচাই করতে হবে।

যারা সাধারণ কলেজ শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী দক্ষতা অর্জন করতে চায়, তারা এইচএসসি ভোকেশনাল বা ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা (বিএম) ধারায় ভর্তি হতে পারে। এই পথে সাধারণ বিষয়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট কারিগরি বা ব্যবসায়িক দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হয়। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড দুই বছর মেয়াদি এইচএসসি বা সমমান পর্যায়ের ভর্তি নির্দেশিকা প্রকাশ করে। ভোকেশনাল বা বিএম থেকে পরবর্তীতে ডিপ্লোমা, উচ্চশিক্ষা বা দক্ষতাভিত্তিক পেশায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে কোর্স ও পরবর্তী উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্পর্কে হালনাগাদ নীতিমালা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। অন্যদিকে, দাখিল উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা দুই বছর মেয়াদি আলিম পর্যায়ে ভর্তি হতে পারে। ইসলামি শিক্ষা, আরবি ভাষা, ধর্মতত্ত্ব ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে যারা পড়তে চায়, তাদের জন্য এটি উপযুক্ত। আলিম শেষে ফাজিল, কামিল ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকতে পারে; তবে নিজের লক্ষ্য ইসলামি শিক্ষা ও গবেষণা, নাকি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উচ্চশিক্ষা—তা আগে বুঝে নিতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবামুখী পেশায় আগ্রহীদের জন্য নার্সিং, মিডওয়াইফারি ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা আকর্ষণীয় হতে পারে। বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল এসব কোর্সের ভর্তি নীতিমালা প্রকাশ করে। তবে ভর্তির আগে আবশ্যিক বিষয়, জিপিএ, বয়স, ভর্তি পরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনসংক্রান্ত শর্ত ভালোভাবে জানা জরুরি। এসব কোর্সের যোগ্যতা ও সময়সূচি প্রতি বছর বদলাতে পারে; তাই সরকারি ওয়েবসাইট বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞপ্তি ছাড়া অন্য কোনো তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

দ্রুত কর্মদক্ষতা অর্জন করতে চাইলে পলিটেকনিক বা ডিপ্লোমা শিক্ষা কার্যকর বিকল্প হতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সাধারণত চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয়। সিভিল, কম্পিউটার, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস, মেকানিক্যাল, পাওয়ার, আর্কিটেকচার, অটোমোবাইল, রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিতে সুযোগ রয়েছে। টেক্সটাইল, কৃষি, মৎস্য, লাইভস্টক, ফরেস্ট্রি ও মেডিক্যাল টেকনোলজিতেও ডিপ্লোমা পাওয়া যায়। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তালিকায় এসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য মেলে। ডিপ্লোমার মূল শক্তি হলো তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষা ও শিল্পখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা। তবে ‘চাকরি হবে’—এই ভেবে নয়, বরং যে প্রযুক্তিতে ভর্তি হবে তার কাজের ধরন, নিজের গণিত-বিজ্ঞান প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদিত কি না, ল্যাব ও কর্মশালার ব্যবস্থা এবং শিক্ষক সংখ্যা পর্যাপ্ত কি না—এসবও দেখতে হবে।

শুধু দীর্ঘমেয়াদি কোর্সই নয়; এসএসসির পর কম্পিউটার, গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, মোবাইল সার্ভিসিং, ড্রাইভিং, সেলাই ও পোশাক প্রযুক্তি, কৃষি, পশুপালন, মৎস্য চাষ, ভাষা শিক্ষাসহ বিভিন্ন ট্রেডভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের সুযোগও আছে। তবে স্বল্পমেয়াদি কোর্স কখনোই মূল শিক্ষার বিকল্প নয়; এটি দক্ষতা বাড়ানোর সহায়ক মাধ্যম। যে কোর্সই হোক, প্রতিষ্ঠান স্বীকৃত কি না, প্রশিক্ষক দক্ষ কি না, বাস্তব কাজ শেখানো হয় কি না এবং কোর্স শেষে সনদ পাওয়া যাবে কি না—যাচাই করা দরকার।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষার্থীকে নিজেকে পাঁচটি প্রশ্ন করতে হবে—১. কোন বিষয়ে সত্যিকারের আগ্রহ আছে? ২. তত্ত্বভিত্তিক পড়াশোনায় বেশি স্বচ্ছন্দ, নাকি ব্যবহারিক ও কারিগরি কাজে? ৩. পছন্দের পেশায় যেতে কী ধরনের শিক্ষা প্রয়োজন? ৪. প্রতিষ্ঠানের মান, খরচ ও যাতায়াত পরিবারের জন্য বাস্তবসম্মত কি না? ৫. পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান? ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ফলাফলই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। মাঝারি ফল নিয়েও পরিকল্পিত পড়াশোনা, দক্ষতা অর্জন ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে সফল হওয়া সম্ভব। আবার ভালো ফল করেও ভুল বিষয়ে ভর্তি হলে হতাশা তৈরি হতে পারে।

অভিভাবকদের উচিত সন্তানের ইচ্ছা, সক্ষমতা ও মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া। অন্যের সন্তান কোন কলেজে বা কোন বিষয়ে পড়ছে—এটি সিদ্ধান্তের প্রধান মানদণ্ড হতে পারে না। সন্তানের ওপর নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা চাপিয়ে না দিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা, পেশাজীবীদের পরামর্শ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপথ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। ভর্তির বিজ্ঞপ্তি, আসনসংখ্যা, ফি, যোগ্যতা ও সময়সূচি প্রতি শিক্ষাবর্ষে বদলাতে পারে; তাই কলেজ ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আনুষ্ঠানিক নোটিশ অনুসরণ করতে হবে। এসএসসির পর কলেজ, পলিটেকনিক, ভোকেশনাল, আলিম, নার্সিং বা দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ—প্রতিটি পথেই সম্ভাবনা আছে। সফলতার জন্য দরকার নিজের আগ্রহ ও যোগ্যতার সঙ্গে মানানসই পথ বেছে নেওয়া, সঠিক প্রতিষ্ঠান বাছাই এবং ধারাবাহিক পরিশ্রম। কোনো একটি পথ নিজে থেকে কাউকে সফল করে না; বরং সঠিক সিদ্ধান্ত, দক্ষতা, সততা ও অধ্যবসায়ই শিক্ষার্থীকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। *লেখক: ফয়সাল হাবিব, প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বাঞ্ছারামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া