বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় নানা ধর্মাবলম্বী মানুষের অবদান অপরিসীম — এমন মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। তাঁর ভাষ্য, এই দেশের ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘকাল ধরে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে আসছেন। ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির যে চর্চা এখানে বিদ্যমান, বরিশালের গৌরনদীতে আয়োজিত আন্তঃধর্মীয় সংলাপে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।
সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে গৌরনদী ক্যাথলিক চার্চ পরিদর্শন শেষে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এম জহির উদ্দিন স্বপন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। চার্চের ফাদার লিটন ফ্রান্সিস গোমেজের সভাপতিত্বে প্রায় এক ঘণ্টার এই আয়োজনে সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠারও আগে থেকেই ধর্মীয় স্বাধীনতার ধারণাটি বিদ্যমান ছিল — উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, দেশটি গঠনের শুরুর দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস অবাধে চর্চার আশায় সেখানে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সে কারণেই ধর্মীয় স্বাধীনতা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি আরও জানান, প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতির পক্ষে তাদের অবস্থান তুলে ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার অন্যতম মূলনীতি ধর্মীয় স্বাধীনতা — এই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, কেউ যেন নিপীড়ন বা সহিংসতার ভয় ছাড়াই নিজ ধর্ম পালন করতে পারে, সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা সহজ কাজ নয়; এটি রক্ষায় ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব অনেক বড়। কোনো ধর্মীয় বিরোধ দেখা দিলে তা যেন বড় সংঘাতে রূপ না নেয়, সেদিকে স্থানীয় ও ধর্মীয় নেতাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখার প্রয়োজন। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই ধারণাটিকে একটি চমৎকার উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রেও বর্তমানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উৎসব সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংলাপে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংগ্রামকে সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে রূপ দিতে হলে দেশে সামাজিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। তাই সব নাগরিকের মধ্যে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা জরুরি। ধর্মীয় সম্প্রীতি শুধু সুখ-শান্তির বিষয় নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি জড়িত বলে মন্তব্য করেন তিনি। দেশে সামাজিক স্থিতিশীলতা থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতিশীল হয় — এ কথাও জানান তথ্যমন্ত্রী।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব উল্লেখ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া বাংলাদেশের অনেক অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে বলেও উল্লেখ করেন তিনি, যা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
সংলাপে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম, আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিরুপম মজুমদার, কলেজ অব ক্রিশ্চিয়ান থিওলজি বাংলাদেশের উপাচার্য রেভারেন্ড পলাশ রায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বক্তব্য দেন গৌরনদী উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব শরীফ জহির সাজ্জাদ হান্নান, আগৈলঝাড়া উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব বশির আহমেদ (পান্না), ধর্মীয় নেতা মাওলানা আসাদুজ্জামান, যতীন্দ্রনাথ মিস্ত্রী, ফাদার মাইকেল দেউরিসহ বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা। সংলাপে মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বিষয় এবং পারস্পরিক ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থান নিয়ে মতবিনিময় করেন।
সংলাপ শেষে মার্কিন রাষ্ট্রদূত দুপুরে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর গৌরনদী উপজেলার সরিকল এলাকার বাসভবনে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকা থেকে লঞ্চে করে রোববার সকালে দুই দিনের সফরে বরিশালে পৌঁছান। প্রথম দিন সকালে ঝালকাঠির ভীমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাজার ও পেয়ারাবাগান ঘুরে দেখেন তিনি, এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ডিয়ান ডাও। পরে দুপুরে বরিশালে ফিরে সদর উপজেলার কড়াপুরের ঐতিহাসিক মিয়াবাড়ি মসজিদ পরিদর্শন করেন। এরপর তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কীর্তনখোলা নদীতে নৌবিহারে অংশ নেন।




