২০০৮ সালে এক চমকপ্রদ ঘটনায় স্তম্ভিত হয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের প্রতিনিধিরা। ব্যাটারির তরল পদার্থ বা ইলেকট্রোলাইট ভর্তি গ্লাসটি এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি নিমেষে পান করে ফেলেন — সাধারণ মানুষের জন্য যা প্রাণঘাতী। নিজের প্রতিষ্ঠানের তৈরি ব্যাটারি কতটা নিরাপদ তা প্রমাণ করতেই এই দুঃসাহসিক কাণ্ড করেছিলেন ওয়াং চুয়ানফু। এই ঘটনার পরেই বাফেটের বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে বিওয়াইডিতে ২৩২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়, যা কোম্পানিটিকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে তোলে।
ওয়াংয়ের জীবনকাহিনি যেকোনো রূপকথাকেও হার মানায়। ১৯৬৬ সালে চীনের আনহুই প্রদেশের অতি দরিদ্র কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি, আর দুই বছর পর মায়ের আকস্মিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়ে সংসার। আট ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ওয়াংয়ের পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে বড় ভাই স্কুল ছেড়ে দিনমজুরের কাজ নেন এবং মেজ বোন বিয়ে করে দেন — ভাইয়ের শিক্ষার খরচ জোগাতেই এই নিঃস্বার্থ ত্যাগ। রসায়নশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা শেষে ব্যাটারি প্রযুক্তিতে বেইজিং থেকে মাস্টার্স করেন তিনি।
১৯৯৫ সালে শেনজেনে আত্মীয় লু জিয়াংইয়াংয়ের কাছ থেকে ৩ লাখ ডলার ঋণ নিয়ে বিওয়াইডি প্রতিষ্ঠা করেন ওয়াং। শুরুতে এটি ছিল মুঠোফোনের রিচার্জেবল ব্যাটারির ছোট কারখানা। সে সময় জাপানি কোম্পানিগুলোর বাজারে রাজত্ব ছিল, কিন্তু তাদের দামি রোবট ও যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরতা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছিল। ওয়াং উল্টো পথে হাঁটেন — নিজেই সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির নকশা করেন এবং দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে খরচ কমান। এই কৌশলে ২০০২ সালের মধ্যে মটোরোলা ও নকিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যাটারি সরবরাহকারী হয়ে ওঠে বিওয়াইডি।
২০০৩ সালে দেউলিয়া সরকারি গাড়ি নির্মাতা কিনচুয়ান অটোমোবাইল কিনে নেওয়ায় বিনিয়োগকারীরা তাঁকে 'পাগল' ভেবেছিলেন, শেয়ারদর এক ধাক্কায় ৩১ শতাংশ কমে যায়। কিন্তু ওয়াং বুঝেছিলেন ভবিষ্যৎ ব্যাটারিনির্ভর গাড়িশিল্পে। ২০০৫ সালে সাশ্রয়ী 'এফ-৩' মডেল বাজারে আনা হয়, যা টয়োটা করোলার মতো দেখতে হলেও দাম ছিল অর্ধেক। ২০০৯ সাল নাগাদ এটি চীনের সবচেয়ে বিক্রিত মডেলে পরিণত হয়।
বাফেটের সহযোগী চার্লি মুঙ্গার প্রথম ওয়াংকে 'আবিষ্কার' করেন। ফরচুন সাময়িকী অনুযায়ী, মুঙ্গার তাঁকে টমাস এডিসন ও জ্যাক ওয়েলচের সংমিশ্রণ বলে আখ্যায়িত করেন। ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো চীনের শীর্ষ ধনীর তালিকায় স্থান পান ওয়াং। ব্লুমবার্গ তাঁকে 'অ্যান্টি-ইলন মাস্ক' বলেও অভিহিত করেছে। প্রচারের আলো এড়িয়ে চলা ওয়াং আজও শেনজেনের কারখানার ক্যানটিনে সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে খান। বিদেশ ভ্রমণে ইকোনমি ক্লাসে যাতায়াত এবং নিজের সুটকেস নিজে বহন করা তাঁর অভ্যাস। একবার গুরুত্বপূর্ণ সভার আগে রাস্তার পাশের দোকান থেকে সস্তা জুতো ও শার্ট কিনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
বিওয়াইডির সাফল্যের মূল রহস্য 'ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন' বা স্বনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা। টেসলা বা ফোর্ড যখন ব্যাটারি বা চিপের জন্য অন্য সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করে, বিওয়াইডি নিজেরাই গাড়ির আসন থেকে সেমিকন্ডাক্টর চিপ পর্যন্ত তৈরি করে। করোনা মহামারির সময় যখন বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে, তখন এই স্বনির্ভরতার কারণে রেকর্ড মুনাফা করে বিওয়াইডি। ওয়াং মাত্র সাত দিনে মাস্ক তৈরির মেশিন তৈরি করে ফেলেন এবং কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্বের বৃহত্তম মাস্ক উৎপাদনকারী হয়ে ওঠে তাঁর প্রতিষ্ঠান — প্রায় ৩ হাজার প্রকৌশলীর বিশেষ দল নিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ মাস্ক তৈরি করত তারা।
ইলেকট্রিক গাড়ির নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিওয়াইডি উদ্ভাবন করেছে 'ব্লেড ব্যাটারি'। লিথিয়াম আয়রন ফসফেট সমৃদ্ধ এই ব্যাটারি এতটাই নিরাপদ যে এটি গাড়ির কাঠামোর শক্তিও বাড়ায়। প্রতিদ্বন্দ্বী টেসলাও এখন তাদের কিছু মডেলে এই ব্যাটারি ব্যবহার করছে। ২০১১ সালে ব্লুমবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইলন মাস্ক বিওয়াইডির গাড়ি দেখে তাচ্ছিল্য করেছিলেন, কিন্তু ২০২৩ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে বিক্রিতে টেসলাকে ছাড়িয়ে বিশ্বের শীর্ষ ইভি নির্মাতা হয় বিওয়াইডি। সম্প্রতি এক্সে (সাবেক টুইটার) মাস্ক নিজেই স্বীকার করেছেন, বিওয়াইডির গাড়ি বর্তমানে বাজারে শক্তিশালী প্রতিযোগী। ফোর্বস রিয়েল-টাইম বিলিয়নিয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, ওয়াং চুয়ানফুর বর্তমান সম্পদ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার।
ইউরোপের হাঙ্গেরি ও তুরস্কে কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে বিওয়াইডি এখন চীনের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক সম্প্রসারণে মনোযোগী। লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে পুরোপুরি চালকবিহীন গাড়ি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার লক্ষ্য নিয়েছে বিওয়াইডি। তাদের নতুন 'জুয়ানজি' স্মার্ট আর্কিটেকচার প্রতিটি গাড়িকে মূলত শক্তিশালী রোবটে পরিণত করবে বলে জানা যাচ্ছে।




