অন-ডিমান্ড কন্টেন্টের বাজারে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) একটি বড় অস্ত্র হিসেবে দেখছে নেটফ্লিক্স। স্ট্রিমিং জায়ান্টটির সহ-প্রধান নির্বাহী টেড সারানডোস জানিয়েছেন, পাঁচ পর্বের ডকুমেন্টারি সিরিজ ‘দ্য আমেরিকান এক্সপেরিমেন্ট’-এর জন্য এআই-সমৃদ্ধ ১৭ মিনিটের ফুটেজ তৈরি করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার তুলনায় “দ্বিগুণ দ্রুততায় এবং অর্ধেক ব্যয়ে” সম্পন্ন হয়েছে। এই তথ্য এমন এক সময়ে এলো যখন নেটফ্লিক্সের কন্টেন্ট খাতে বার্ষিক ব্যয় ২০২৪ সালের ১৬.২ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১৭.১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, এবং চলতি বছর সর্বোচ্চ ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

তবে এই ব্যয়বৃদ্ধির সাথে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির গতি বিপরীতমুখী। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে ১৩ শতাংশে নেমেছে, এবং তৃতীয় প্রান্তিকের জন্য পূর্বাভাস মাত্র ১২ শতাংশ। ফলে বৃহস্পতিবার প্রত্যাশা অনুযায়ী আয়ের ফলাফল প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তী লেনদেনে নেটফ্লিক্সের শেয়ারদর ৯ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। বিনিয়োগকারীদের ধৈর্য যেন ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে।

এআই-এর ব্যবহার নিয়ে সারানডোস ব্যাখ্যা করেন, জেনারেটিভ এআই বিশেষত নির্মাণ-উত্তর (পোস্ট-প্রোডাকশন) প্রক্রিয়ায় সৃজনশীল দলগুলোকে আরও বেশি কার্যকারিতা অর্জনে সহায়তা করছে। বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে নেটফ্লিক্সের নেতৃত্ব জানান, নির্মাণ-উত্তর দলগুলো জনসমাগমের দৃশ্য, উদ্বোধনী বিশ্ব-নির্মাণ শট এবং ঐতিহাসিক যুদ্ধের দৃশ্যায়নে এআই ব্যবহার করেছে। সারানডোস বলেন, “সৃজনশীলদের এই সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করলে তাদের সক্ষমতা বাড়বে এবং প্রোগ্রামিংয়ে খরচ করা প্রতি ডলারের প্রভাবও বৃদ্ধি পাবে।” তিনি আরও যোগ করেন, ফলে নির্মাণের সময়সীমা সংকুচিত হবে এবং গুণগত মান উন্নত হবে। খরচ সাশ্রয়ের অর্থ পুনরায় কন্টেন্টে বিনিয়োগ করা হবে, যা সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে রাজস্ব-মুনাফার একটি স্থায়ী চক্র তৈরি করবে।

তবে হলিউডে এআই-এর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত আছে। ২০২৩ সালে নেটফ্লিক্সসহ স্টুডিওগুলোর বিরুদ্ধে শ্রমিক ধর্মঘটে এআই-এর ব্যবহার ও সুরক্ষা ছিল অন্যতম প্রধান ইস্যু। নেটফ্লিক্সের জন্যই ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করা গিয়ের্মো দেল তোরো গত বছর বলেছিলেন, জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করার চেয়ে তিনি “বরং মৃত্যুকেই” প্রাধান্য দেবেন। এতদসত্ত্বেও নেটফ্লিক্স এআই গ্রহণে পিছপা হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চে তারা অভিনেতা বেন অ্যাফ্লেকের ফিল্ম প্রযুক্তি কোম্পানি ইন্টারপজিটিভ ৬০০ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয় এবং ২০২৫ সালে ভার্চুয়াল ইফেক্টস ও প্রোডাকশন কার্যক্রম আইলাইন স্টুডিওর অধীনে একীভূত করে।

সারানডোস স্বীকার করেন যে ইন্টারপজিটিভ থেকে এখনও প্রাথমিক স্তরের ফল মিলছে, তবে এই বিনিয়োগ থেকে খরচ সাশ্রয় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কোম্পানিটি এবছর সামগ্রিক কন্টেন্ট ব্যয় ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রত্যাশা করছে, যা গত পাঁচ বছরের ৮ শতাংশ গড়ের চেয়ে বেশি। সরাসরি অনুষ্ঠান সম্প্রচারে (লাইভ প্রোগ্রামিং) নেটফ্লিক্সের জোরালো প্রবেশ এই বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। চলতি বছর লাইভ কন্টেন্ট মোট ব্যয়ের ৫ শতাংশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে, দর্শকের মনোযোগের লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এক্সপ্লোসিভ অপশনসের প্রতিষ্ঠাতা বব ল্যাং মন্তব্য করেন, “নেটফ্লিক্স কেবল ডিজনি বা এইচবিওর সাথে প্রতিযোগিতা করছে না। এটি মাইক্রোসফট, সনি ও নিনটেন্ডোর অনলাইন গেমিং, টিকটক, ফেসবুক ভিডিও, ইউটিউব শর্টস এবং মানুষের ফোনে করা সবকিছুর সাথে পাল্লা দিচ্ছে।” তিনি যোগ করেন, মানুষ একসাথে একাধিক কাজ করতে পারে, কিন্তু কন্টেন্টকে আকর্ষণীয় হতে হবে যাতে পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখা যায়, এটাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে নেটফ্লিক্সের রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ১২.৬ বিলিয়ন ডলার, যা বছওয়ারি ১৩ শতাংশ বেশি। পরিচালন মুনাফার হার ছিল ৩৩.৪ শতাংশ। কোম্পানিটি পূর্ণ বছরের রাজস্ব পূর্বাভাস সংকুচিত করে ৫১ থেকে ৫১.৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমিত করেছে এবং ৩১.৫ শতাংশ পরিচালন মুনাফা মার্জিনের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছে। অর্থাৎ ২০২৬ সালে পরিচালন আয় প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশেরও বেশি হবে। এসবের বাইরে, নেটফ্লিক্স ‘হোয়াট উই ওয়াচড’ সম্পৃক্ততা প্রতিবেদনের প্রকাশনার সময়সূচি পরিবর্তন করে ২০২৭ থেকে বছরে দুইবারের পরিবর্তে একবার করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক শেয়ার পুনঃক্রয় সম্পন্ন করেছে, এই প্রান্তিকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের স্টক কিনেছে। ফেব্রুয়ারিতে ওয়ার্নার ব্রস. ডিসকভারির সাথে প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের একীভূতকরণ চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর সেখান থেকে পাওয়া ২.৮ বিলিয়ন ডলারের ব্রেকআপ ফি এই পুনঃক্রয়ে সহায়তা জুগিয়েছে।