বিশ্বব্যাপী ফিনটেক ও পেমেন্ট খাতে শক্ত অবস্থান তৈরি করা অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এয়ারওয়ালেক্স তাদের কার্যক্রম নতুন দিগন্তে সম্প্রসারণ করছে। কোম্পানিটির সভাপতি লুসি লিউ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রতিষ্ঠানটির নতুন পণ্য টি:জিরো প্রসঙ্গে টেসলার সহায়ক ড্রাইভিংয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, “এটি অনেকটা চালক-সহায়ক ড্রাইভিংয়ের মতো, যেখানে গাড়ি নিজে থেকেই চালিত হয়, কিন্তু চালকও উপস্থিত থাকে।” একটি প্রতিষ্ঠানের পুরো অর্থ বিভাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম এই টি:জিরো সিস্টেম এয়ারওয়ালেক্সের বৃহত্তর কৌশলগত পরিবর্তনের অংশ।

প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিকভাবে ই-কমার্স, গেমিং ও অনলাইন ট্রাভেলের মতো ক্রস-বর্ডার পেমেন্টনির্ভর খাতকে কেন্দ্র করে ব্যবসা সম্প্রসারিত করেছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যেভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও পেমেন্ট মডেল পরিবর্তন করছে, তাতে এয়ারওয়ালেক্সসহ অন্যান্য ফিনটেক প্রতিষ্ঠানও নিজেদের কৌশল বদলাচ্ছে। গত জুন মাসে এয়ারওয়ালেক্স অ্যাডিশনের নেতৃত্বে সিরিজ এইচ ফান্ডিং রাউন্ডে ৩২০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে। বেইলি গিফোর্ড, টি. রো প্রাইস, অ্যামেক্স ভেঞ্চারস এবং ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইস এই রাউন্ডে অংশ নেয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ডিসেম্বরে অ্যাডিশনের নেতৃত্বেই ৩৩০ মিলিয়ন ডলারের ফান্ডিং রাউন্ডে এয়ারওয়ালেক্সের মূল্যায়ন ছিল ৮ বিলিয়ন ডলার।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যাক ঝাং তখন বলেছিলেন, এই অর্থ “এয়ারওয়ালেক্সের পরবর্তী অধ্যায়: স্বায়ত্তশাসিত অর্থায়ন, এজেন্টিক কমার্স এবং উভয়কে শক্তিশালী করার অবকাঠামো”তে দ্রুত এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। ফরচুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লুসি লিউ বলেন, “গত দুই বছরে আমাদের ফান্ডরেইজিং বেশ দ্রুত হয়েছে।” অ্যাডিশনের মতো বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে “চলমান আলোচনার” ফলেই সাম্প্রতিক এই ফান্ডিং রাউন্ড হয়েছে বলেও জানান তিনি। “আমাদের সামনে অনেক কাজ আছে, তাই আমাদের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে যথেষ্ট মূলধন রাখতে চাই।”

এক দশকেরও বেশি আগে মেলবোর্নে প্রতিষ্ঠিত এয়ারওয়ালেক্সের যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ সরানোর সুবিধা দিয়ে। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করা কফিশপ পরিচালনার জটিলতা থেকেই এই ব্যবসার ধারণা জন্মে বলে প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ঝাং ও ম্যাক্স লি জানিয়েছেন। বর্তমানে প্ল্যাটফর্মটিতে ৬ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি ব্যবসা যুক্ত রয়েছে এবং বার্ষিক পুনরাবৃত্ত আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। লাভজনকতা সম্পর্কে নির্দিষ্ট সংখ্যা না বললেও কোম্পানিটি “ইবিআইটিডিএ পজিটিভ” এবং “সুস্থ মোট মার্জিন” রয়েছে বলে জানিয়েছেন লুসি লিউ।

এআই-তে জোর দিয়ে এয়ারওয়ালেক্স এখন টি:জিরোর পাশাপাশি এজেন্টিক কনজিউমার ওয়ালেট ‘আরি’ চালু করেছে, যা এক-ক্লিকে চেকআউটের জন্য ডিজাইন করা। যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো ও ব্রাজিলের মতো নতুন বাজারে আগ্রাসীভাবে সম্প্রসারণ করছে প্রতিষ্ঠানটি। মেক্সিকোতে মেক্সপাগো অধিগ্রহণের মাধ্যমে পেমেন্ট লাইসেন্স পেয়েছে, আবার ক্লায়েন্টদের চাহিদার কারণে ব্রাজিলের বাজারে প্রবেশ করেছে। লুসি লিউ বলেন, “স্থানীয় ব্যবসাগুলো এখন বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণের সহজ উপায় খুঁজছে।” যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও প্রবেশের চেষ্টা চলছে। জ্যাক ঝাং গত নভেম্বরে ফরচুনকে বলেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানি যদি অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য বা কানাডায় কার্যকরভাবে ব্যবসা করতে চায় এবং ব্যাংকিং, পেমেন্ট, ব্যয় ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্টের মতো সবকিছু এক প্ল্যাটফর্মে পেতে চায়, তাহলে সেখানেই এয়ারওয়ালেক্স।”

কয়েক বছর মন্দার পর এশিয়ায় ভেঞ্চার ফান্ডিং পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ার অংশ এয়ারওয়ালেক্সের দ্রুত ফান্ডরেইজিং। কেপিএমজির তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দ্বিতীয় প্রান্তিকে এশিয়ায় ভেঞ্চার-ব্যাকড কোম্পানিগুলো ৫০.৮ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে, যা ২০২১ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের পর সর্বোচ্চ। তবে এই অর্থের একটি বড় অংশ (৩৫.১ বিলিয়ন ডলার) চীন থেকে এসেছে, এবং বেশিরভাগ মনোযোগ এআই ও হার্ডওয়্যারের দিকে। এশিয়ার চারটি বৃহত্তম চুক্তিই চীনা এআই ডেভেলপারদের (ডিপসিক, বাইটডান্স, স্টেপফান ও মুনশট এআই) সঙ্গে। তবে এশিয়ার ভেঞ্চার ফান্ডিং এখনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, যেখানে একই প্রান্তিকে স্টার্টআপগুলো ১৪৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে।

সিরিজ এইচ-এর মতো দেরিতে পর্যায়ের বিনিয়োগ এখন বাড়ছে, আবার অনেক কোম্পানি দীর্ঘদিন প্রাইভেট থাকতে চাইছে। ডেটাব্রিক্সের মতো কোম্পানি অভূতপূর্ব সিরিজ এম ফান্ডিংয়ে ১৮৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যায়নে বিনিয়োগ সংগ্রহ করছে। লুসি লিউ বলেন, “বিনিয়োগকারীরা এখন শেষ পর্যায়ের বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। তাদের কাছে মূলধনের অভাব নেই, কিন্তু তারা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের ট্র্যাক রেকর্ড দেখে তারপর বিনিয়োগ করতে চান।” অনেক কোম্পানি এখনই পাবলিক হতে চাইছে না, যার মধ্যে ডাবলিনভিত্তিক পেমেন্ট জায়ান্ট স্ট্রাইপও রয়েছে, যার আয় ৬.৮ বিলিয়ন ডলার হলেও আইপিওতে যাচ্ছে না। “বড় কোম্পানিগুলো পাবলিক না হয়েও অর্থ সংগ্রহ করতে পারছে,” লিউ উল্লেখ করেন। স্পেসএক্সের ৮৫.৭ বিলিয়ন ডলার ও এসকে হাইনিক্সের ২৬.৫ বিলিয়ন ডলারের মতো বড় আইপিও-র কারণে অন্যান্য কোম্পানির অভিষেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না।

এয়ারওয়ালেক্স অবশ্য বছরের শেষ নাগাদ “আইপিও-র জন্য প্রস্তুত” হওয়ার পরিকল্পনা করছে, তবে চূড়ান্ত তারিখ বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। “বিষয়গুলো জটিল হওয়ায় এখন সঠিক সময় নয়,” লিউ বলেন। এদিকে জুন মাসে চীন-বিরোধী হিসেবে পরিচিত মার্কিন সিনেটর টম কটন ট্রেজারি সেক্রেটারিকে চিঠি লিখে এয়ারওয়ালেক্সের সঙ্গে বেইজিংয়ের গভীর সম্পর্কের অভিযোগ তোলেন। তিনি টেনসেন্ট ও হংশানের (সিকোইয়া চায়না) মালিকানার কথা উল্লেখ করে সম্ভাব্য তদন্তের দাবি জানান। ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট কেইথ রাবোইসও এয়ারওয়ালেক্সকে “সংবেদনশীল মার্কিন তথ্যে চীনা পথ” বলে মন্তব্য করেন। তবে লুসি লিউ সরাসরি চিঠির জবাব না দিলেও নিয়ন্ত্রক পরিবেশকে হুমকির চেয়ে সুযোগ হিসেবে দেখছেন। জ্যাক ঝাং অভিযোগগুলিকে “মিথ্যা” বলে উড়িয়ে দিয়ে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহক ডেটা দেশেই সংরক্ষিত থাকে এবং টেনসেন্টের ১০ শতাংশের কম প্যাসিভ স্টক রয়েছে। এয়ারওয়ালেক্স তৃতীয় পক্ষের অডিটও করতে দিয়েছে। গত জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এয়ারওয়ালেক্সকে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়নবিরোধী বাধ্যবাধকতা নিশ্চিতে বাহ্যিক নিরীক্ষকের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেয়। লুসি লিউ বলেন, প্রতিষ্ঠানটি “সম্পূর্ণ সহযোগিতা” করছে এবং এই তদন্ত শিল্পব্যাপী, কোম্পানিনির্দিষ্ট নয়।

৩৫ বছর বয়সী লুসি লিউ উত্তর চীনে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে স্থানান্তরিত হন। মেলবোর্নে কলেজ শেষ করে হংকংয়ে বার্কলেজ ও চায়না ইন্টারন্যাশনাল ক্যাপিটাল করপোরেশনে কাজ করেন। ২০১৫ সালে কলেজের বন্ধু ম্যাক্স লির মাধ্যমে জ্যাক ঝাংয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর তার স্টার্টআপে ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন। “আমার বয়স তখন ২৫, আর আমার মধ্যে কিছুটা আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল না,” হেসে বলেন লিউ। ফরচুনের মোস্ট পাওয়ারফুল ওমেন এশিয়া তালিকায় স্থান পাওয়া লিউ নিজের লিঙ্গকে গুরুত্ব দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। “মানুষ প্রায়ই বলে: ‘নারীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা খুব কঠিন—আপনি ছাড়া।’ আমি চাই না মানুষ মনে করুক যে তারা ব্যতিক্রম।”

অস্ট্রেলিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তি কোম্পানির উল্লেখযোগ্য উৎস হয়ে উঠেছে। ৪২ বিলিয়ন ডলার মূল্যায়নের ক্যানভা এবং জিরা, কনফ্লুয়েন্স ও ট্রেলোর ডেভেলপার অ্যাটলাসিয়ানের মতো কোম্পানি এয়ারওয়ালেক্সের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এক দশক আগে অস্ট্রেলিয়ার ফাউন্ডাররা কেবল দেশীয় সমস্যা সমাধানে মনোযোগী ছিলেন। লুসি লিউ মনে করেন, তখন সিড মানি সংগ্রহ করাও কঠিন ছিল। এখন অস্ট্রেলিয়ার ভেঞ্চার ফান্ড যুক্তরাষ্ট্র বা এশিয়ার ফান্ডের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে দেশটির প্রত্যন্ত অবস্থান ও অপেক্ষাকৃত ছোট বাজার বৈশ্বিক ব্যবসা শুরুতে বাধা হতে পারে। এয়ারওয়ালেক্স গত বছর সিঙ্গাপুর ও সান ফ্রান্সিসকোকে বৈশ্বিক সহ-সদর দপ্তর করেছে। “অস্ট্রেলিয়া বেশ ছোট,” লিউ স্বীকার করেন, “এবং বড় দল গড়তে চাইলে প্রতিভা এবং বাজারই সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে। ব্যবসাগুলোকে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে ভাবতে হবে।” তবে তিনি মনে করেন, “এআই ও প্রযুক্তি কোম্পানি অস্ট্রেলিয়ায় সম্ভব, তাদের কেবল বৈশ্বিকভাবে বেড়ে উঠতে আরও কিছুটা সাহায্য, তহবিল এবং পরামর্শ প্রয়োজন।”