ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব তেল বাজারে সৃষ্ট অভূতপূর্ব সংকট এখন ওপেক জোটের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় জাহাজ চলাচলের উপযোগী হওয়ায় ওপেকের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে উৎপাদন কোটা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এপ্রিল মাসে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ইরান, ইরাক ও কুয়েতসহ একাধিক দেশ তাদের তেল উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমাতে বাধ্য হয়। এখন প্রণালি স্বাভাবিক হওয়ায় ইরাক ও কুয়েত দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ব্লুমবার্গের তথ্যানুযায়ী, ইরাক দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল উৎপাদনের অনুমতি চাইছে এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ৭০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছানো। অন্যদিকে সৌদি আরবের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ তারা পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছিল।
ওপেকের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক ইরাক জোট ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির তেলমন্ত্রী ব্লুমবার্গকে বলেছেন, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো না হলে ওপেকে থাকা নিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এদিকে গত এপ্রিলে জোটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে ওপেক ছেড়ে গেছে, যা জোটের দুর্বলতার আরেকটি ইঙ্গিত।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ তৈরি করতে পারে। জেপি মরগানের বৈশ্বিক পণ্যবাজার কৌশল বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভা মনে করেন, বাজার ইতিমধ্যে সরবরাহ কমিয়ে চলতে শিখে গেছে, ফলে আবার তেল বাজারে এলে অস্থায়ী উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হবে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ কিয়েরান টমকিন্সের মতে, আগামী বছর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারে এবং ২০২৮ সালে ৫০ ডলারে নেমে আসতে পারে।
তবে ওপেক এখনো জোট ধরে রাখার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি ওপেক প্লাস দৈনিক ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মার্চের পর পঞ্চম ধাপের উৎপাদন বৃদ্ধি। অন্যদিকে সৌদি আরবের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ক্যাপিটাল অ্যাডভাইজরসের প্রধান নির্বাহী জে হ্যাটফিল্ড বলেন, ওপেকের সবচেয়ে বড় উৎপাদক সৌদি আরবের সামনে ইরাক বা কুয়েতের মতো উৎপাদন বাড়ানোর তেমন চাপ নেই, বরং বৈশ্বিক চাহিদা পুরোপুরি ফিরে আসার আগে উৎপাদন বাড়ালে দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ম্যাককোয়ারি গ্রুপের বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস কৌশলবিদ বিকাশ দ্বিবেদী এক সম্ভাবনা উল্লেখ করেন যে, সৌদি আরব উৎপাদন এতটাই বাড়াতে পারে যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসবে। তার মতে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হয়তো প্রতিযোগীদের চাপে ফেলতে এই পথ বেছে নিতে পারেন, কারণ দীর্ঘদিন কম দাম ধরে রাখার আর্থিক সামর্থ্য তাদের আছে। তবে দ্বিবেদী মনে করেন এটি নিশ্চিত নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়।
এই পরিস্থিতিতে ভোক্তা দেশগুলোর জন্য কিছুটা স্বস্তি এলেও ওপেকের বড় উৎপাদক দেশগুলো বড় ধাক্কা খেতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশের অর্থনীতি তেল রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। ইরান যুদ্ধের সময় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, এখন যদি সেই সংকট থেকে সবচেয়ে বড় উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয়, তাহলে এটি হবে প্রকৃত অর্থেই নির্মম পরিহাস।




