যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া থেকে মেইন পর্যন্ত বিস্তৃত অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইলের দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ১৯০ মাইল বা ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি। বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত এই দীর্ঘ পদযাত্রার পথটি আবারও জয় করতে মরিয়া হয়েছেন ৯১ বছরের ডেল ‘গ্রে বিয়ার্ড’ স্যান্ডার্স। তাঁর লক্ষ্য, এক বছরের মধ্যে পুরো পথ হেঁটে শেষ করা। তবেই সবচেয়ে বেশি বয়সে এই ট্রেইল পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড আবারও তাঁর দখলে আসবে।
গ্রীষ্মের প্রথম দিনে নিউ হ্যাম্পশায়ারের হোয়াইট মাউন্টেনসের ফ্রাঙ্কোনিয়া রিজের দিকে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন স্যান্ডার্স। সামনে ছিল খাড়া ও পাথুরে পথ। ছোট একটি ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে নিজেকে মনে করিয়ে দিলেন, আজকের দিনে শুধু একটি কাজ করা যাবে না—পড়ে যাওয়া। পাহাড়ে হাঁটার জন্য ৯১ বছর বয়সে এর চেয়ে ভালো নিয়ম আর কী-ই বা হতে পারে!
২০১৭ সালে ৮২ বছর বয়সে প্রথমবার পুরো অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইল হেঁটে সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে রেকর্ড গড়েছিলেন স্যান্ডার্স। কিন্তু ২০২১ সালে এম জে এবেরহার্ট (ট্রেইল নাম ‘নিম্বলউইল নোম্যাড’) সেই রেকর্ড ভেঙে দেন। রেকর্ড হারালেও দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। স্যান্ডার্স নিজেই এবেরহার্টকে নতুন রেকর্ড গড়তে উৎসাহ দিয়েছিলেন। এমনকি এবেরহার্ট কয়েকবার পথ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবলে স্যান্ডার্স গিয়ে তাঁর সঙ্গে শেষ কয়েক দিন হেঁটেছিলেন, যাতে বন্ধু হাল ছেড়ে না দেয়। তবু নিজের পুরোনো রেকর্ড ফিরে পাওয়ার ইচ্ছাটা ছিলই।
এবারের পরিকল্পনা বেশ গোছানো। প্রতিদিন প্রায় ১২ মাইল বা ১৯ কিলোমিটার হাঁটবেন তিনি, সপ্তাহে এক দিন বিশ্রাম। আবহাওয়ার সুবিধা কাজে লাগিয়ে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার হার্পার্স ফেরি থেকে দক্ষিণের দিকে হাঁটা শুরু করেন, পরে সেখানে ফিরে উত্তরের অংশে যাত্রা করেন। তাঁর সঙ্গে থাকে পিকআপ ট্রাকের পেছনে তৈরি ছোট্ট ক্যাম্পার—‘বেজ ক্যাম্প অন হুইলস’। বিভিন্ন সময়ে স্বেচ্ছাসেবকেরা গাড়িটি চালান, খাবার রান্না করেন এবং পরের দিনের পথ পরিকল্পনা করতে সাহায্য করেন। প্রথম ৮০০ মাইলের সময় গাড়িটি চালিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু এবেরহার্ট, যিনি এখন ৮৭ বছর বয়সে নিজেও বয়সের রেকর্ডের দৌড়ে আছেন।
হোয়াইট মাউন্টেনসের আবহাওয়া ভয়ংকর—ঝড়, বৃষ্টি, কুয়াশা আর প্রচণ্ড বাতাস হঠাৎ করেই হাজির হতে পারে। এক সপ্তাহ আগে এক ঝড়ে একজন ট্রেইলকর্মী স্যান্ডার্সকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, এগোলে জীবন বিপন্ন হতে পারে। ঝড় থামার পর আবার পথ ধরেছেন তিনি। ফ্রাঙ্কোনিয়া রিজে ওঠার সময়ও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে—প্রচণ্ড বাতাস, ঘন কুয়াশা আর তিরের মতো বৃষ্টি। পথের কিছু অংশ এত দুর্গম যে হাত-পা ব্যবহার করে পাথর বেয়ে উঠতে হয়। এক জায়গায় স্যান্ডার্স থমকে যান, কারণ ২০১৭ সালে পাড়ি দেওয়া পথটিও তাঁর কাছে পরিচিত মনে হচ্ছিল না। এবারের পথ আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ কঠিন মনে হয়েছে; ২০১৭ সালের নিজের শরীরের সঙ্গে এখনকার শরীরের তুলনা করলে পার্থক্যটা স্পষ্ট। তিনি চেয়েছিলেন আগের অবস্থায় ফিরতে, কিন্তু চেষ্টা করেও পারেননি।
তবে ইচ্ছাশক্তির কোনো সীমা নেই তাঁর। ছোটবেলায় কেন্টাকির তামাকখেতে বড় হওয়া স্যান্ডার্স স্কুলে অনেক উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছিলেন। পড়াশোনায় ভালো না হলেও খেলাধুলায় নিজের জায়গা খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই প্রতিযোগিতার মানসিকতাই আজও তাঁকে পাহাড়ের পথে টানে। ২০০২ সালে নেভির পার্ক ও বিনোদন বিভাগ থেকে অবসরের পর ৮০তম জন্মদিন উদ্যাপন করেছিলেন মিসিসিপি নদীর পুরোটা প্যাডেল করে পাড়ি দিয়ে। অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইলের রেকর্ডের কথা জানার পর আর থামতে পারেননি।
পথে নানা বয়সের মানুষের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। কেউ কয়েক মাইল হাঁটেন, কেউ ছবি তোলেন, কেউ দূর থেকে শুভেচ্ছা জানান। ২৮ বছর বয়সী গ্যারিসন গ্যান্ডি (ট্রেইল নাম ‘ডাবলওয়াইড’) ও ২৯ বছর বয়সী নিকোলাস লুকাইডিসের মতো তরুণরা তাঁর সঙ্গী হয়েছেন। ২৩ বছর বয়সী এমা বার্টলেট মজা করে বলেছিলেন, ৯১ বছর বয়সেও যদি তিনি হাঁটতে পারেন, তাহলে তিনি তো আনন্দে লাফাতে থাকবেন।
সামনে এখন মেইনের ‘১০০ মাইল ওয়াইল্ডারনেস’—অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইলের সবচেয়ে দুর্গম অংশ, যেখানে নিয়মিত সরবরাহ পাওয়ার সুযোগ কম। উত্তর ক্যারোলিনার স্মোকি মাউন্টেনসের একটি অংশও বাকি। বর্তমান গতিতে ৩৬৫ দিনেই পুরো পথ শেষ করতে পারবেন বলে হিসাব কষছেন তিনি। তবে রেকর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে নামে আসুক বা না আসুক, তাতে কিছু যায় আসে না। এই যাত্রা তাঁর কাছে শুধু রেকর্ডের নয়—নিজেকে বারবার পরীক্ষা করার গল্প। বয়স বাড়ুক, শরীর আগের মতো থাকুক বা না থাকুক, ইচ্ছাটা আগের মতোই শক্ত। তিনি থামবেন না, যতক্ষণ শরীর সায় দিচ্ছে।




