রাত গভীর, পরদিন সকালেই অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার ডেডলাইন। আগেকার দিনে এমন রাতে গুগলের সার্চ রেজাল্ট আর বইয়ের পাতা ঘেঁটে সময় পার করতেন শিক্ষার্থীরা। তবে প্রযুক্তির বদৌলতে এখন দৃশ্যপট পুরো বদলে গিয়েছে। মাত্র কয়েকটা শব্দের প্রম্পট দিলেই চ্যাটজিপিটি কিংবা জেমিনাইয়ের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুল নিমেষেই তৈরি করে দিচ্ছে প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্টের খসড়া, বা জটিল বিষয়ের সরলীকৃত ব্যাখ্যা।
উচ্চশিক্ষায় এই প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে এক নিরব বিবর্তন। সময় বাঁচানোর পাশাপাশি কঠিন বিষয় দ্রুত বোঝার কাজে এটি এখন শিক্ষার্থীদের অবিচল সঙ্গী। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীই এআইকে শেখার হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন। তবে বাড়তি সুবিধার এই চাদরের নিচে একটি মৌলিক প্রশ্নও উঁকি দিচ্ছে—এআই কি প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীদের পারদর্শী করে তুলছে, নাকি এটি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করছে তাদের মৌলিক চিন্তাভাবনা ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা?
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষার্থী রুবাইয়েত হোসেন পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘এআই কাজের গতি নিঃসন্দেহে বাড়িয়েছে এবং কঠিন কন্টেন্ট সহজবান করে দিয়েছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির ওপর বাড়াবাড়ি রকমের নির্ভরশীলতা গভীর চিন্তা এবং সৃজনশীলতার চর্চাকে সংকুচিত করে ফেলছে।’ তার এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে অনেক সহপাঠী একমত হয়েছেন এবং অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে গভীরঅধ্যভ্যাস হারিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
এআইয়ের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন একই বিভাগের অপর শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান। তিনি জানান, প্রযুক্তিটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বহু সময় বিভ্রান্তিকর বা ভুল তথ্য পরিবেশন করে। বিষয়টির ওপর আগাম ধারণা না থাকলে এই ভুলগুলো ধরা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, যা শিক্ষার্থীদের বিপাকে ফেলে দেয়। কম্পিউটার কৌশলী এন এ নোমানের মতেও এই আত্মবিশ্বাসী ভুল তথ্য এড়াতে সতর্কতা জরুরি। তিনি পরামর্শ দেন, ‘এআই থেকে পাওয়া সব তথ্য অন্ধভাবে মেনে নেওয়া উচিত নয়। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ডেটা নির্ভরযোগ্য সোর্স থেকে যাচাই করে নেওয়াটা অপরিহার্য। সেই সঙ্গে, ডিপফেক ভিডিও বা ভুয়া ছবি বানানো এখন সহজ হয়ে ওঠায় ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি করাও এখন সময়ের দাবি।’
শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গিও শিক্ষার্থীদের চেয়ে আলাদা নয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী এআইকে শিখনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ মনে করলেও দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এআই তাৎক্ষণিক তথ্য প্রাপ্তিতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানার্জন ও সৃজনশীলতার প্রসারের জন্য বইপাঠ ও স্বাধীনচিন্তার কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং এটিকে কেবল একটি সহায়ক উপকরণ হিসেবেই গ্রহণ করা উচিত।’
একযুগ ছিল যখন ক্যালকুলেটর ও ইন্টারনেটের আবির্ভাবেও একই ধরনের আশঙ্কা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেগুলো শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। এআইও হয়তো একই পথে হাঁটছে। তথাপি প্রযুক্তির যতই উন্নতি ঘটুক না কেন, শিখনের মূল ভিত্তি হিসবে থাকবে মানুষের সহজাত কৌতূহল, যুক্তিবোধ ও উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই যাত্রায় সহযাত্রী হতে পারে বটে, কিন্তু জ্ঞানার্জনের দায়ভার একমাত্র মানুষকেই বহন করতে হবে।


