চীনের জিয়াংসু প্রদেশের কুনশানে বসবাসরত ওয়াং জিবিং পেশায় একজন খাদ্য সরবরাহ কর্মী। কিন্তু ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার চালিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি তার আরেকটি পরিচয় তাকে আরও বড় পরিসরে উজ্জ্বল করে তুলেছে। তিনি এখন বিশ্ববন্দিত এক কবি, যাকে সকলে শ্রদ্ধা ও ভালোবেসে ‘ডেলিভারি পোয়েট’ বলে ডাকে। তার ছুটে চলা জীবনের প্রতিটি বিরতিকে কবিতায় রূপান্তরিত করার অসাধারণ প্রতিভা তাকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক প্রশংসা ও মর্যাদা।

সাধারণ কবি বা লেখকদের মতো নিরিবিলি টেবিলে বসে লেখার অভ্যাস ওয়াং জিবিংয়ের কোনোকালেই ছিল না। ডেলিভারি কাজের সংক্ষিপ্ত বিরতিতে, কখনও টুকরো কাগজ, কখনও আবার ডেলিভারির স্লিপের উল্টো পৃষ্ঠা অথবা নিজের হাতের তালুই হয়ে ওঠে তার কবিতার খাতা। নিজের মনের অন্দরে লুকিয়ে থাকা অনুভূতি এবং পথে দেখা সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামকে তিনি সহজ সাবলীল ভাষায় তুলে আনেন। তব পঙক্তিতে অভাব নেই গভীর উপলব্ধির, দার্শনিক চিন্তার ও অর্থের সৌন্দর্যের। শহরের কোলাহলের মাঝে তার সহকর্মী ডেলিভারি কর্মীদের চাপা কষ্ট, গৃহহিংসা, জীবনের ভালো-মন্দ সবই অবলীলায় তার কবিতায় স্থান পায়।

ইতিমধ্যেই ৫৭ বছর বয়সী এই কবির হাত ধরে রচিত হয়েছে ছয় হাজারেরও অধিক কবিতা। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পাঁচটি। ২০২৩ সালে প্রথম গ্রন্থ ‘আ ম্যান ইন আ হারি’ প্রকাশের পর সেবছরই দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘আই ক্লামজিলি লাভ দিস ওয়ার্ল্ড’ প্রকাশিত হয়। ২০২৪ সালে বের হয় ‘ফ্লাইং লো’। তার অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘হোল্ডিং আ বিম অব লাইট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ ও ‘দ্য ওয়ার্ল্ড লাইটস মি আপ’। চলতি ২০২৬ সালে ‘ফ্লাইং লো’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বিখ্যাত লু সুন সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। পাশাপাশি, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রোমের ইতালিয়ান রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনে তার জীবন ও কবিতার উপর নির্মিত ‘থ্রি ইন দি আফটারনুন: দ্য গ্লোবাল ইকো অব আ ডেলিভারি পোয়েট’ নামক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।

ওয়াং জিবিং-এর জন্ম চীনের এক প্রত্যন্ত গাঁয়ে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে জীবিকার সন্ধানে বাড়ি ছাড়েন। টিকে থাকতে খনি নির্মাণশ্রমিক, বালুপরিবহণ শ্রমিক কিংবা ছোট দোকানের কর্মীর মতো বিভিন্ন শ্রমসাধ্য পেশায় কাজ করেছেন। ২০১৮ সালে খাদা সরবরাহকারীর পেশাটিকে চূড়ান্ত হিসেবে বেছে নেন। অদ্যাবধি তার ছুটে চলা বন্ধ হয়নি। প্রায় পৌনে দুই লাখ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন নিজের ইলেকট্রিক বাইকে।

লু সুন পুরস্কার লাভের পরও কেন তিনি ডেলিভারির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, এমন প্রশ্নে ওয়াং জানান, এটাই তার জীবন এবং তিনি নিজেকে চেনেন। তার মতে, যদি তিনি খাদা সরবরাহ ছেড়ে দেন, তবে সাধারণ মানুষ ও তাদের প্রতিদিনের জীবনচর্চার ‘ধোঁয়া আর আগুন’ থেকে ছিন্ন হয়ে যাবেন। আর সেই বিচ্ছিন্নতায় কবিতার প্রাণবেগ ও স্পন্দন হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ওয়াং-এর কবিতা ও জীবন এখন চীনা ‘শ্রমিক-সাহিত্য’র পুনর্জাগরণের এক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তার ব্যক্তিগত সফলতা প্রমাণ করে, নিতান্ত সাধারণ ও ক্লিনজীবন থেকেও সৃষ্টি সম্ভব উঁচুমানের শিল্প। ডেলিভারির প্রতিযোগিতাময় জীবনের কথা তার বিখ্যাত ‘ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলা লোক’ কবিতায় যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি উঠে এসেছে মানবিক মায়া ও কোমলতার কথাও। নিজের এলাকার শিশুদের নিরাপদে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, ডেলিভারির সময় অতিরিক্ত একটি রেইনকোট রাখা এবং বৃষ্টিতে আটকে পড়া অচেনা মানুষকে সাহায্য করার মাধ্যমেও তার জীবনদর্শনের প্রতিফলন ঘটে।

ওয়াং জিবিংয়ের কবিতা শুধু ব্যক্তিগত আর্তি নয়, এটি এক বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা বলে। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ফ্লাইং লো’ চলতি বছরেই ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। তার মতে, কবিতা লেখা হলো পেশানিরপেক্ষ এক ভালোবাসা, যা বেছে নেওয়ার অধিকার সবার আছে। খাবারের প্যাকেট হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে এবং কলম হাতে ভাবনার জগতে ডুবে তিনি দুয়োরেই কড়া নাড়বেন— এটাই যেন তার জীবনের অমোঘ নিয়ত।