মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাসদস্যদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও ও ছবি ইরানের কাছে গোয়েন্দা তথ্যের উৎস হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা জোরদার করতে কাজে লাগতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা একটি অপ্রকাশিত চিঠির বরাতে জানা গেছে, তিনি ২৮ জুলাই এই সতর্কবার্তা প্রদান করেন।
কুপার তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেন, সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের অনলাইন পোস্টের মাধ্যমে যখন সেনাদের প্রতিক্রিয়া, স্থিরচিত্র ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, তখন ইরান প্রায় রিয়েল-টাইমে বুঝতে পারে তাদের হামলা কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ওপেন-সোর্স তথ্য প্রকাশের কারণে মার্কিন সেনা ও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’ যদিও এ বিষয়ে কী কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা তিনি সুনির্দিষ্টভাবে জানাননি।
পরিস্থিতি বিবেচনায় জর্ডানে অবস্থানরত কিছু মার্কিন সেনাকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নিজ নিজ মোবাইল ফোন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে বলে দুইটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। জর্ডান ইরানের ঘন ঘন হামলার শিকার একটি রাষ্ট্র। তৃতীয় আরেকটি সূত্র জানায়, অপারেশনাল নিরাপত্তার স্বার্থে সমগ্র অঞ্চলজুড়েই একই রকম কড়াকড়ি আরোপের বিষয়টি বিবেচনাধীন আছে, তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনও গৃহীত হয়নি। এ বিষয়ে সেন্টকমের এক মুখপাত্র বলেন, অ্যাডমিরাল কুপারের বার্তাটি সেনাদের অপারেশনাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতেই প্রেরিত হয়েছে।
চিঠিতে অ্যাডমিরাল কুপার বিশেষভাবে একটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। চলতি মাসেই জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের প্রাণঘাতী হামলার সময় এক সেনাসদস্য মেটার ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট চশমা পরে একটি ভিডিও ধারণ করেছিলেন, যেখানে তাঁদের বাংকারে আশ্রয় নেওয়ার দৃশ্য ধরা পড়ে। এই ভিডিও পরে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা হয়। তার মতে, এমন তথ্য প্রচার না হলে ইরানের পক্ষে তাদের হামলার ফলাফল নির্ধারণ করা কঠিন হতো, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ইলেকট্রনিক জ্যামিংসহ নানা কৌশল ব্যবহার করে থাকে। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, কোনো আঘাত লক্ষ্যবস্তুর থেকে ৫০ মিটার দূরে পড়েছে, নাকি খালি রানওয়েতে বা জনাকীর্ণ স্থাপনায় লেগেছে, তা ইরানের জানা থাকে না। গণমাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রকাশিত হওয়াকে তিনি ইরানের বিনা মূল্যে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ করে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা শুরু করা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত ও ৬০০-র বেশি আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এত বিপুল পরিমাণ হতাহতের ঘটনায় মার্কিন জনমতেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, বর্তমানে প্রতি তিন নাগরিকের মধ্যে মাত্র একজন এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট আরও তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে রাডার টাওয়ার, ব্যারাক, বিমানের হ্যাঙ্গারসহ সামরিক অবকাঠামোের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ এবং যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালানো হামলার পেন্টাগনের তদন্ত রিপোর্ট। সিএনএনের এক তদন্তে দাবি করা হয়েছে, মিনাবের ওই স্কুলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ১৫৬ জন নিহত হন।
মোবাইল ফোন জব্দ করার সম্ভাব্য পদক্ষেপের খবরে ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন সেনাদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। যুদ্ধকালীন সময়ে বিদেশে অবস্থানরত সেনাদের মোবাইল ব্যবহারের বিধিনিষেধ বাহিনী ভেদে ভিন্ন হতে পারে। কিছু সূত্র উল্লেখ করেছে, বাণিজ্যিকভাবে প্রাপ্ত মোবাইল লোকেশন ডেটা ব্যবহার করেও মার্কিন সেনাদের টার্গেট করার নজির আছে। সেন্টকম প্রধানের মতে, কোনো হামলার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ পেয়ে গেলে তা ইরানি বাহিনীকে আরও ভয়াবহ দ্বিতীয় দফার হামলা চালানোর জন্য তাৎক্ষণিক সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।




