বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। গত মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোতে মোট জমার পরিমাণ ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা (৩৯.৮১ শতাংশ) জমা রয়েছে কোটিপতি হিসাবধারীদের কাছে, যেখানে জমার পরিমাণ ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে, ১ লাখ থেকে ৯৯ লাখ টাকা জমা থাকা লাখপতি হিসাবগুলোর দখলে রয়েছে ১২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জমার প্রায় ৫৬ শতাংশ। ফলে কোটিপতি ও লাখপতি হিসাবধারীরা মিলে নিয়ন্ত্রণ করছেন ব্যাংকে জমা অর্থের ৯৬ শতাংশ।
বিপরীতে, ব্যাংক হিসাবের সংখ্যার দিক থেকে ছোট জমাদারদের আধিপত্য। মোট ১৮ কোটি ২৬ লাখ হিসাবের মধ্যে ১৬ কোটি ৩৩ লাখের বেশি হিসাবে জমা আছে ১ টাকা থেকে ১ লাখ টাকার কম। যদিও সংখ্যার দিক থেকে এরা ৯০ শতাংশের বেশি, কিন্তু জমা অর্থের পরিমাণ মাত্র ৮৯ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, যা মোট জমার মাত্র ৪ শতাংশ।
গত ডিসেম্বর থেকে মার্চ—এই তিন মাসে ব্যাংক খাতে নতুন আমানত এসেছে ৫৭ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এর প্রায় অর্ধেক (২২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা) গেছে কোটিপতি হিসাবে। এই সময়ে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ২ হাজার ৪৪১টি। সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবে। মাত্র ২ হাজার ৭৪টি হিসাবে জমা আছে ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা, যেখানে ডিসেম্বরের তুলনায় বেড়েছে ২৪ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। তবে কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণিতে, যেমন ১৫-২০ কোটি ও ২০-২৫ কোটি টাকা জমার হিসাবে আমানত কমেছে।
বিশেষজ্ঞ মতামতে জানা যায়, এই পরিসংখ্যানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক—উভয় ধরনের হিসাবই অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, ব্যক্তি হিসাবের তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে জমা বেশি থাকাই স্বাভাবিক। সরকারি ও বেসরকারি বড় প্রতিষ্ঠানের জমা থাকায় কোটিপতি হিসাবের অর্থের পরিমাণ বেশি হয়। অন্যদিকে, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, নির্বাচন ও ঈদুল ফিতরের কারণে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে আস্থার ঘাটতি থাকায় অনেকে টাকা তুলে অন্য খাতে বিনিয়োগ করছে।
ছোট জমাদারদের মধ্যে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা জমা থাকা হিসাবে মোট জমা সবচেয়ে কম—৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা থাকা হিসাবের সংখ্যা ১৩ কোটি ৭৭ লাখের বেশি, কিন্তু সেখানে জমা আছে মাত্র ৭ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই শ্রেণির অধিকাংশই শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষ, যারা সঞ্চয়ের চেয়ে লেনদেনের জন্যই ব্যাংক ব্যবহার করে।




