যুক্তরাষ্ট্রের খনি খাত এখন এক গুরুতর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ খনিজ ভান্ডার নিজের মাটিতে থাকা সত্ত্বেও দেশটিতে একটি নতুন খনি চালু করতে প্রায় ২৯ বছর সময় লেগে যায়—আবিষ্কার থেকে উৎপাদন পর্যন্ত। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের এক গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাজারে মার্কিন অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

বিগত প্রশাসনের তুলনায় বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহে চীনের ওপর নির্ভরতাকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে। গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খনি শিল্পের প্রায় ২০০ শীর্ষ নির্বাহী ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেন। এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল প্রয়োজনীয় খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী খনি শিল্পের ভিত গড়ে তোলা। সংকট মোকাবিলায় এটি ছিল প্রশাসনের সাম্প্রতিকতম প্রচেষ্টা।

মূল সমস্যা কিন্তু ভূতাত্ত্বিক বা অর্থনৈতিক নয়; বরং পুরো প্রক্রিয়াটিই জটিল। গড়ে একটি খনির জন্য অনুমোদন পেতেই ৭ থেকে ১০ বছর কেটে যায়, সেটাও আবার নির্মাণ শুরুর আগেই। মূল বাধা হলো নিয়মের পুনরাবৃত্তি—একটি খনির জন্য জাতীয় পরিবেশ নীতি আইন, পরিচ্ছন্ন পানি আইন, বিপন্ন প্রজাতি আইন এবং পরিচ্ছন্ন বায়ু আইনসহ একাধিক আইনের ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজ্যগুলোর নিজস্ব বিধিনিষেধ, যেগুলো বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। ফলে একই বিষয়ে একাধিক সংস্থার পরস্পরবিরোধী এখতিয়ার দেখা দেয়। কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রে এই পর্যালোচনা সমন্বয়ের জন্য কোনো একক কার্যালয় নেই।

এ ছাড়া আইনি জটিলতা সমস্যাকে আরও প্রকট করছে। সব ছাড়পত্র পাওয়ার পরও একটি খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে লাগাতার মামলার সম্মুখীন হতে হয়। অ্যারিজোনার রোজমন্ট কপার খনির মতো প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর আদালতের লড়াইয়ের কারণে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্য হারিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরাও পিছিয়ে আসছেন। গত ১৫ বছরে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় খনিজ অনুসন্ধানে ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে, যদিও খনিজ মজুদ প্রায় সমান। খনি চালু করতে ওই দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম সময় লাগে।

এই দীর্ঘসূত্রিতা দূর করতে প্রশাসন নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে কাজ শুরু করেছে। দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। এর পরপরই ইন্টেরিয়র ডিপার্টমেন্ট একটি জরুরি অনুমোদন ট্র্যাক চালু করে, যার মাধ্যমে সরকারি জমিতে খনি ও ড্রিলিং প্রকল্পের অনুমোদন ২৮ দিনের মধ্যে মিলতে পারে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এতে সাধারণত ১ থেকে ২ বছর বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪ বছর পর্যন্ত সময় লাগত।

এ ছাড়াও প্রশাসন আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১৬০টি খনিজ চুক্তি স্বাক্ষর বা অনুমোদন করা হয়েছে, যার মোট মূল্য প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। গত শুক্রবারের গোলটেবিল বৈঠকে নতুন খনি ও খনিজ প্রক্রিয়াকরণে ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কর্মী উন্নয়নের জন্য আলাদা করে ১৮০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি মাইনিং স্কুলে ১০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত। এটি অত্যন্ত জরুরি, কারণ ধারণা করা হচ্ছে আগামী তিন বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান খনি কর্মীদের প্রায় অর্ধেক অবসরে যাবেন। ইউক্রেন ও ইরান সংঘাতের কারণে হ্রাস পাওয়া অস্ত্রের মজুদ পূরণের জন্যও এই খাতে গতি আনা দরকার।

খনি উদ্যোগের অন্যান্য বাধা স্থায়ীভাবে দূর করতে কংগ্রেসের আইন প্রণয়নও প্রয়োজন। গত ডিসেম্বরে প্রতিনিধি পরিষদে স্পিড অ্যাক্ট পাস হয়েছে। এই আইনটি ফেডারেল অনুমোদনের বিরুদ্ধে মামলা করার সময়সীমা ৬ বছর থেকে কমিয়ে ১৫০ দিনে আনার, নিষেধাজ্ঞা প্রতিকার হিসেবে বাদ দেওয়ার, সম্পূর্ণ পরিবেশগত পর্যালোচনার প্রয়োজন হয় এমন প্রকল্পের পরিধি সংকুচিত করার এবং একই ধরনের প্রকল্পের জন্য পুরোনো পরিবেশগত গবেষণা পুনর্ব্যবহারের সময়সীমা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করেছে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের সময়সীমা কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রতিনিধি পরিষদে পাসের আট মাস পরেও বিলটি সিনেটের পরিবেশ ও পাবলিক ওয়ার্কস কমিটিতে আটকে আছে, এমনকি এর কোনো সমান্তরাল আইনও এখনো উত্থাপিত হয়নি।