জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেছিলেন জিয়াউর রহমান—এটিই প্রকৃত সত্য। শনিবার রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন হলে ‘মুক্তিযুদ্ধে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট: ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) এই আয়োজন করে।
স্পিকার তাঁর বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধ, তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে যথাযথভাবে মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ছয় দফার ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেসময় স্বাধীনতার কোনো প্রশ্নই ওঠেনি; বরং পাকিস্তানি কাঠামোর মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল মুখ্য। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের প্রসঙ্গ টেনে স্পিকার দাবি করেন, সেই ক্র্যাকডাউনের ঠিক আগে তাজউদ্দীন আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতা ঘোষণার অনুরোধ জানালে শেখ মুজিব তা প্রত্যাখ্যান করেন। শেখ মুজিবের বক্তব্য ছিল, তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারেন না এবং পাকিস্তান ভাঙতে তার কোনো অবদান থাকুক—এটি তিনি চান না। তাই স্বাধীনতার ঘোষণা তিনি দেননি বলে উল্লেখ করেন স্পিকার।
খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা আরও বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা, গণহত্যা ও নির্যাতনে জাতি যখন বিপর্যস্ত, তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং সেই সময় মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় জাতি উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, হাজার হাজার ছাত্র-যুবক ঘর-বাড়ি ছেড়ে এসে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। স্পিকার জোর দিয়ে বলেন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ না করলে বাংলাদেশ হয়তো এখনো পাকিস্তানের অংশ থাকত। তিনি উল্লেখ করেন, মুক্তিবাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ, কিন্তু তাদের মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন তথা চার হাজার সৈন্য ছিল। বাকিরা ছিলেন সাধারণ মানুষ—রিকশাচালক, মুদি দোকানদার, বাসের হেলপার, ড্রাইভার, পিয়ন, শিক্ষক, ছাত্র-যুবক—সব পেশার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের এই নেতৃত্বের কথা যথাযথভাবে স্থান পায়নি বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
মুক্তিযুদ্ধকে কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ হিসেবে না দেখিয়ে স্পিকার একে ‘জনতার যুদ্ধ’ এবং ‘বাঙালির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ১৯৭১ সালে যারা যুদ্ধ দেখেনি তারা দুর্ভাগা এবং যারা দেখেছে তারা সৌভাগ্যবান। বাঙালির আত্মত্যাগের সেই মহাকাব্যিক ইতিহাস ভবিষ্যতেও জাতিকে গর্বিত করবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়ে স্পিকার বলেন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের কোনো জাতির চেয়ে বাঙালিরা ছোট নয়।
আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) জামিলউদ দীন আহসান, মেজর জেনারেল (অব.) জাহাংগীর কবির তালুকদার, নৌবাহিনীর কমডোর (অব.) জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া। কবি জাকির আবু জাফর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে তাঁর নিজের লেখা কবিতা পাঠ করেন। রাওয়ার চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক স্বাগত ও মূল বক্তব্য প্রদান করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাবেক সেনা কর্মকর্তা, কবি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।




