প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিডিয়া প্রতিষ্ঠান ট্রুথ সোশ্যাল তাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা থেকে সরে এসে আবারও মূল ব্যবসায় মনোযোগ দিচ্ছে। সোমবার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক সম্মেলন কলের মাধ্যমে কোম্পানিটি জানিয়েছে, তারা তাদের বেশিরভাগ নতুন উদ্যোগ বন্ধ করে দিয়ে মূল মিডিয়া ব্যবসায় ফিরে আসছে। এই নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউসের খবর দ্রুত পাওয়ার জন্য একটি বিশেষ পরিষেবা চালু করা হয়েছে, যা ইতিমধ্যেই নৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ডেমোক্র্যাট এবং সরকারি ওয়াচডগ সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপকে ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
২০২১ সালে টুইটার ও ফেসবুক থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল চালু করেছিলেন। তবে তিন বছরেরও বেশি সময় আগে উক্ত প্ল্যাটফর্মগুলোতে তাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকেই কোম্পানিটিকে নিজেকে নতুন করে সাজাতে হয়েছে। এটি এখন আর শুধু 'মুক্ত বাক্য'র ফোরাম নয়, বরং এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে যেখানে ব্যবহারকারীরা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সরাসরি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খবর পান — ইরান যুদ্ধ, শুল্ক নীতি বা মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ — সবকিছুই এখানে প্রথমে পাওয়া যায়। কোম্পানিটিকে অনেকটা হোয়াইট হাউসের দ্বিতীয় প্রেস অফিসের মতো দেখাচ্ছে।
এর আগে কোম্পানিটি শেয়ারের দর পড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন অসংলগ্ন খাতে বিনিয়োগ করেছিল। অনলাইন জুয়া, ফিন্যান্স, বিনিয়োগ তহবিল, বিটকয়েন ক্রয় ও সংরক্ষণ এবং পারমাণবিক শক্তি — এমনকি এই খাতগুলোতেও তারা প্রবেশ করেছিল। কিন্তু কোনো কিছুই তাদের শেয়ারের দাম ধরে রাখতে পারেনি। ফলে তারা আবারও মূল উদ্দেশ্যে ফিরে এসেছে, তবে এবার কিছুটা ভিন্নভাবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পোস্টগুলো দ্রুত অ্যাক্সেস করার সুবিধা তারা এখন অর্থের বিনিময়ে দেবে।
কোম্পানিটির নতুন প্রধান নির্বাহী কেভিন ম্যাকগার্ন বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছেন, এই বিশেষ পরিষেবার জন্য ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি হাই-স্পিড ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান চুক্তি করেছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মাসে ৬০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করছে। ম্যাকগার্ন জানান, এই ব্যবসা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং সম্ভাব্য গ্রাহক হিসেবে ডেটা সেন্টার, সংবাদ সংস্থা এবং বড় ভাষা মডেল নির্মাতাদের কাছে তারা পৌঁছাচ্ছেন। এই পরিষেবা ঘিরে নৈতিক প্রশ্ন তুললেও ম্যাকগার্ন তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, অন্য সামাজিক মিডিয়া সংস্থাগুলোও একই ধরনের পরিষেবা দেয়। হোয়াইট হাউসও কোনো দ্বন্দ্বের বিষয় অস্বীকার করেছে।
ওয়াল স্ট্রিটের ব্যবসায়ীরা হোয়াইট হাউসের খবর দ্রুত পেলে বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জন করতে পারেন, তাই তারা এই পরিষেবায় সাইন আপ করছেন। শুরু হওয়ার পর এক সপ্তাহেই ১০টি প্রতিষ্ঠান চুক্তি করেছে। সংখ্যাটি ছোট মনে হলেও কোম্পানির জন্য এটি বড় আর্থিক সহায়তা। মাসিক গ্রাহকদের কাছ থেকে বার্ষিক ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার আসতে পারে, যা কোম্পানির গত বছরের মোট আয়ের দুই থেকে তিন গুণ।
তবে ট্রাম্প মিডিয়ার অর্থের প্রয়োজন অনেক বেশি। গত বছরের শুরু থেকে কোম্পানিটি ১০০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ৩০ জুন শেষ হওয়া ত্রৈমাসিকে আরও ২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার লোকসান হয়েছে, যদিও এর বেশিরভাগই বিটকয়েনের দরপতনের কারণে কাগুজে ক্ষতি। কোম্পানির উপর আরও চাপ রয়েছে ঋণদাতাদের কাছ থেকে। বিশেষ চুক্তির আওতায় ঋণদাতারা ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তাদের কনভার্টিবল নোট ফেরত দাবি করতে পারবেন। এই তারিখটি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক পরে, ফলে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিলে কোম্পানির উপর প্রভাব পড়তে পারে। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনসহ বেশ কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, তারা ক্ষমতা পেলে ট্রাম্প মিডিয়ার তদন্ত শুরু করবেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ শেষ হওয়ার পর কী হবে। ট্রাম্পই এই প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, তার ১ কোটি ৩০ লাখ ফলোয়ার রয়েছে। তার ছেলে ডোনাল্ড জুনিয়রের ফলোয়ার ৭৫ লাখ। অন্যান্য জনপ্রিয় পোস্টারদের মধ্যে রয়েছেন এফবিআই ডিরেক্টর কাশ প্যাটেল এবং স্বাস্থ্যসচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র। তবে ট্রাম্পের অনুপস্থিতিতে ট্রেডাররা কেন বছরে ১২ লাখ ডলার দিয়ে তার পোস্ট দেখবে — সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই প্ল্যাটফর্মে পাঁচ লাখ ফলোয়ার নিয়ে একটি 'জোকার' হিসেবে থাকতে পারেন, কারণ ২০২৮ সালে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ শেষ হবে।
ম্যাকগার্ন যে আরেকটি ব্যবসা ধরে রাখছেন তা হলো নিউক্লিয়ার ফিউশন। এটি এখনও বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য নয়, তবে বর্তমান প্রশাসনের কাছ থেকে এটি বড় সমর্থন পাচ্ছে। জুনে মার্কিন জ্বালানি বিভাগ একটি 'রোড ম্যাপ' প্রকাশ করেছে, যেখানে নিউক্লিয়ার ফিউশনের উন্নয়নে সরকারি তহবিল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবুও বিনিয়োগকারীরা ট্রাম্প মিডিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশ্বস্ত নন। ২০২৪ সালে পাবলিক হওয়ার পর শেয়ার ৬২ ডলারে বন্ধ হয়েছিল, কিন্তু এখন তা এক অঙ্কের ঘরে নেমে গেছে। সোমবার কোম্পানিটির শেয়ার আরও ৮% কমে ৯.৩৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে।




