প্রতিদিন অন্তত একটি করে পুরোনো ধাঁচের ফোনকল করার অভ্যাস এখন নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এআই-সম্পর্কিত রুটিন বলে মনে করছেন এক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী। জুম বা টিমস মিটিং নয়, কোনো এআই নোটটেকার পেছনে কাজ করছে—এমন কিছুই নয়; শুধু একটি সাধারণ ফোনকল। কারণ, এই কলের পর তাঁকে স্মৃতি থেকে পুরো কথোপকথন পুনর্গঠন করতে হয়। কী বলা হলো, কোন বিষয়গুলো উঠে এলো, কোথায় কী সংযোগ—সব নিজেকেই মনে রাখতে হয় এবং পরে নিজের এআই এজেন্টদের জন্য তার সারসংক্ষেপ তৈরি করতে হয়। অর্থাৎ, তিনি আগে নিজের কাজটি করেন, প্রযুক্তি পরে আসে।

ছোট এই অভ্যাসটি তিনি গ্রহণ করেছেন কারণ এআই নিয়ে চলমান অতিরঞ্জন ও হতাশার চক্র সম্পর্কে তিনি গভীরভাবে ভাবছেন। প্রতিটি আলোচনাই যেন দুই চরমের মধ্যে দুলছে—হয় এআই শিল্পবিপ্লবের দ্বিতীয় আগমন হিসেবে অভূতপূর্ব উৎপাদনশীলতা ও নতুন শিল্প তৈরি করবে, নয়তো সব চাকরি মুছে দিয়ে সম্পদ শুষে নেবে। সত্য, যেমনটা সাধারণত হয়, এর মাঝখানে।

এই ভাবনা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে সম্প্রতি পড়া 'ইয়েস্টারইয়ার' উপন্যাসের প্রসঙ্গে। সোশ্যাল মিডিয়ার এক 'ট্র্যাড ওয়াইফ' হঠাৎ ১৮৫৫ সালে জেগে ওঠে এবং প্রকৃত গৃহিণী হয়ে ওঠার গল্প। সময়ভ্রমণ নয়, বরং বইটি নারীর জীবনের দুই চরমপন্থা তুলে ধরে—পরিবারে নিজেকে পুরোপুরি বিলিয়ে দেওয়া এবং কর্পোরেট সিঁড়ি বেয়ে ক্যারিয়ারে সব উৎসর্গ করা। সাত সন্তানের মা এবং একজন CEO হিসেবে তিনি মনে করেন, এই দুই পথের কোনোটি-ই আবশ্যক নয়।

মজার ব্যাপার হলো, বইটি পড়তে উৎসাহ দিয়েছিলেন তাঁর ১৯ বছর বয়সী মেয়ে সোফিয়া। দুজনেরই উপলব্ধি—মধ্যপথ খুঁজে নিতে হবে। সোফিয়ার প্রজন্ম যেন সেই পথই খুঁজছে। আগের প্রজন্ম Merrill, McKinsey বা Morgan Stanley-তে ইন্টার্নশিপের স্বপ্ন দেখত, কিন্তু এই প্রজন্ম শুরু করছে ছোট ব্যবসা—এমনকি আবর্জনার পাত্র চাপ দিয়ে পরিষ্কার করার মতো উদ্যোগও। এই স্টার্টআপ ধারণাগুলো চটকদার নয়, কিন্তু তারাই নিজেদের সময়, কাজ ও জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়—স্বায়ত্তশাসনই তাদের লক্ষ্য।

কয়েক সপ্তাহ আগে Fortune-এ তাঁদের দুইজনের লেখা দুটি প্রবন্ধ পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছিল। স্বাধীনভাবে লেখা, শেষ না হওয়া পর্যন্ত একজন আরেকজনের লেখা পড়েননি। তাঁর শিরোনাম ছিল, "এক বছর আগের তুলনায় তিন গুণ ভালো CEO আমি এখন" এবং সোফিয়ার লেখার শিরোনাম, "আমি চাই না এআই আমার জন্য ভাবুক"। সোফিয়া এআই নিয়ে গভীর সন্দিহান, তিনি পুরোপুরি আশাবাদী।

প্রবন্ধ প্রকাশের পর থেকে তিনি ভাবছেন—এআই অর্থনীতিতে কী করবে তা নিয়ে নয়, বরং এআই তাঁর নিজের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে। নিজের চিন্তার কোন অংশগুলো তিনি আউটসোর্স করছেন? কয়েক দশকে গড়ে তোলা কোন দক্ষতা নিঃশব্দে ক্ষয় হতে শুরু করেছে? তাঁর নিজের উত্তর—শোনার দক্ষতা। সারা ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল গভীরভাবে শুনে সেই মুহূর্তেই ধারণাগুলো সংশ্লেষ করা—প্যাটার্ন শোনা, সংযোগ তৈরি করা, পরের প্রশ্ন করা। এখন প্রতিটি মিটিং রেকর্ড করা যায়, প্রতিটি কথোপকথন ট্রান্সক্রিপ্ট, সারসংক্ষেপ, বিশ্লেষণ এমনকি সমালোচনা পর্যন্ত করা যায় AI দিয়ে। প্রলোভন হলো মনোযোগ দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া, কারণ মেশিন তো দিচ্ছেই।

এই অভ্যাসের মাধ্যমেই তিনি সেই প্রলোভন প্রতিরোধ করছেন। দিনে একবার পুরোনো পদ্ধতিতে ফোনকল করেন, যা রেকর্ড করা হয় না। তারপর AI-এর সাহায্য নেওয়ার আগে নিজেই সেটি পুনর্গঠন করেন। তাঁকেই মনে রাখতে হয়, সারসংক্ষেপ করতে হয়, মূল সূত্র ব্যাখ্যা করতে হয়। এরপরই কেবল তা এজেন্টদের হাতে তুলে দেন। এটি এমন একটি জ্ঞানীয় পেশির ব্যায়াম যা তিনি হারাতে চান না।

কারণ শোনার সবচেয়ে মানবিক অংশটি হলো ট্রান্সক্রিপশন নয়, বরং খেয়াল করা। দ্বিধা টের পাওয়া, যা বলা হয়নি তা চিনে নেওয়া, প্যাটার্ন দেখার আগেই ধারণার সংযোগ তৈরি করা। যদি সবাই অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেয় কারণ এআই পরে ধরবে, তাহলে কথোপকথনে আসলে কে থাকবে? সম্ভবত এটিই মধ্যপথ যা এআই আমাদের খুঁজতে বলছে। প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান না করা, আত্মসমর্পণও না করা; বরং এমনভাবে ব্যবহার করা যাতে নিজের চিন্তা শক্তি দুর্বল না হয়ে আরও শক্তিশালী হয়।