ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নে অবস্থিত মেঘনা নদীর তীরবর্তী কাঁঠালকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আলফাজ উদ্দিন। তিনি নাসিরনগর চাতলপাড় ডিগ্রি কলেজের ডিগ্রি (পাস) ও সার্টিফিকেট কোর্সের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। কিন্তু গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কোনো বেতন-ভাতা পাননি। তাঁর সংসার চলে বর্গা নেওয়া জমিতে ফলানো ধনেপাতা, পুঁইশাক, ডাঁটা ও বেগুন বিক্রির আয় দিয়ে। আলফাজ উদ্দিন প্রথম আলোকে জানান, কলেজে যোগ দেওয়ার পর থেকে এক টাকাও বেতন পাননি তিনি। নিজেদের কোনো জমি না থাকায় ২০ শতক বর্গা জমিতে কৃষিকাজ করেই সংসার চালাতে হচ্ছে। প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন, যা জোগাড় করতে তাকে ও তার ছেলেকে মাঠে ও বাজারে কাজ করতে হয়। তিনি আরও বলেন, অনেকে তাকে অবহেলার চোখে দেখেন। গ্রামের কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত গেলে তা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, কারণ সংসারের খরচ জোগাতেই হিমশিম খেতে হয়। একই কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক আবদুর রশিদ ২০১৪ সালে যোগ দিয়েছেন এবং তিনিও কোনো বেতন-ভাতা পাননি। তাঁর স্ত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেও তাঁর একার আয়ে সংসার চলে না। তাই জমিজমা বিক্রি করতে হয়েছে এবং বর্তমানে সবজি চাষের পাশাপাশি টিউশনি করেন। কলেজে যাতায়াতেই প্রতিদিন তাঁর ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ হয়। চাতলপাড় ডিগ্রি কলেজে মোট ২৭ জন শিক্ষক রয়েছেন, যার মধ্যে ১৭ জন বেতন-ভাতা পান। বাকি ১০ জন শিক্ষক ১১ থেকে ১৫ বছর ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করাচ্ছেন। কলেজটির ডিগ্রি (পাস) ও সার্টিফিকেট কোর্স জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত হলেও দীর্ঘদিন এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষকদের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত। কলেজের অধ্যক্ষ মো. ওমর আলী জানান, ডিগ্রি শাখা চালুর পর থেকে তিনবার এমপিওভুক্তির আবেদন করা হলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। কলেজের আয় সীমিত হওয়ায় শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তিনি বলেন, কোনো রকমে পরিচালন ব্যয় মেটানো হয় এবং এমপিওভুক্তির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ১৯৯৫ সালে মেঘনা নদীঘেঁষা দুর্গম এলাকায় কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নাসিরনগর সফরে এসে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা দেন। স্থানীয় ব্যক্তিদের দান করা প্রায় তিন একর জমির ওপর গড়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১১ সালে বিএ (পাস) ও ২০১৫ সালে বিএসএস (পাস) কোর্স চালু হয়। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি মিলিয়ে প্রায় ৫৫০ শিক্ষার্থী পড়ছে, যার মধ্যে ডিগ্রি শাখায় প্রায় ২০০ জন। উপজেলা সদর থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার, যার মধ্যে ১৪ কিলোমিটার নৌপথ ও বাকি অংশ কাঁচা সড়ক। বর্ষাকালে কলেজে পৌঁছাতে দু-তিন ঘণ্টা সময় লাগে। কলেজ সূত্রে জানা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা সন্তোষজনক ফল করলেও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষকদের আর্থিক স্বীকৃতি মিলছে না। সম্প্রতি কলেজ কর্তৃপক্ষ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি কলেজের ডিগ্রি (পাস) কোর্স এমপিওভুক্ত করার দাবিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ দপ্তরে আধা সরকারি পত্র দিয়েছেন। বছরের পর বছর বেতন ছাড়াই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া এই শিক্ষকদের আশা, একদিন কলেজের ডিগ্রি শাখা এমপিওভুক্ত হবে এবং তখন শিক্ষকতাই হবে তাদের পরিবারের প্রধান অবলম্বন।