ইন্ডিয়া কতুর উইক ২০২৬-এর মঞ্চে প্রথমবারের মতো নিজস্ব কতুর সংগ্রহ নিয়ে হাজির হয়েছেন ডিজাইনার অর্পিতা মেহতা। তাঁর মতে, ফ্যাশনের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু নতুনত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে তাকে সময়ের উপযোগী করে তোলার মধ্যেই নিহিত। এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর নতুন সংগ্রহ ‘সেরিমোনিয়াল’-এ। গত এক দশক ধরে ভারতীয় উৎসব ও বিবাহের পোশাকের জগতে নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন অর্পিতা। উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার, সূক্ষ্ম কারুকাজ ও আধুনিক নারীত্বের সমন্বয় তাঁর নকশার পরিচিত বৈশিষ্ট্য। তবে এতদিন পর কেন তিনি ইন্ডিয়া কতুর উইকের মঞ্চে এলেন? অর্পিতার ব্যাখ্যা, ‘সেরিমোনিয়াল’ এমন একটি গল্প যা পৃথক পৃথক পোশাকে নয়, বরং পুরো সংগ্রহটি একসঙ্গে দেখলেই সম্পূর্ণতা পায়। আর সেই গল্প বলার জন্য র্যাম্পের চেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম আর কিছু হতে পারে না।
এই সংগ্রহে ভারতের কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন অর্পিতা। বেনারসি ও টিস্যু কাপড়ের সঙ্গে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে কাঁথা সূচিশিল্প। তবে এগুলোকে আধুনিক দেখানোর জন্য জোর করে পরিবর্তন করা হয়নি। বরং প্রতিটি কারুশিল্পের নিজস্ব সৌন্দর্য ও ইতিহাস অক্ষুণ্ন রেখেই সমসাময়িক রূপ দেওয়া হয়েছে। অর্পিতার মতে, কোনো ঐতিহ্যকে আধুনিক করার অর্থ তার পরিচয় মুছে ফেলা নয়। বরং সেই শিল্পের আত্মাকে সম্মান জানিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই একজন ডিজাইনারের দায়িত্ব। কাঁথার প্রতিটি সেলাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন কারিগরের সময়, যত্ন ও অনুভূতি। তাই এই শিল্পকে বদলে ফেলার চেষ্টা নয়, বরং তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে নিজের নকশার ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করেছেন তিনি।
র্যাম্পে দেখা গেছে স্কাল্পচারড লেহেঙ্গা, করসেট ব্লাউজ, সিকুইন শাড়ি-গাউন, মিরর ওয়ার্ক গাউন এবং ড্রামাটিক কেপের মতো নানা পোশাক। প্রতিটি ডিজাইনেই রাজকীয়তার পাশাপাশি আধুনিকতার ছোঁয়া ছিল স্পষ্ট। অর্পিতার মতে, আজকের কনে আর একটি দিনের জন্য একটি মাত্র পোশাকেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। বিয়ের প্রতিটি আয়োজনের জন্য তিনি আলাদা ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করতে চান। তাই এখনকার কনের কাছে আরাম, ব্যক্তিগত স্টাইল এবং সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকবে এমন নকশার গুরুত্ব অনেক বেশি। এই কারণে তাঁর নতুন সংগ্রহে ভারী কারুকাজের পাশাপাশি হালকা গঠন, সহজে পরার সুবিধা এবং স্বচ্ছন্দ চলাফেরার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
অর্পিতা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে শুধু সাজসজ্জার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কারুশিল্পের ইতিহাস, কৌশল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কারিগরের হাতে সেই শিল্প বেঁচে আছে, তাঁদের সম্মান জানানোই প্রকৃত দায়িত্ব। তাঁর বিশ্বাস, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে মুছে দেয় না; বরং সেটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে পৌঁছে দেয়। ভারতীয় বিয়ে মানেই রাজকীয় আয়োজন—এই ঐতিহ্য কখনোই হারিয়ে যাবে না বলে মনে করেন তিনি। তবে এখন মানুষ শুধু ভারী অলংকরণ নয়, উন্নত কারুশিল্প, সুন্দর কাপড় এবং নিখুঁত নির্মাণকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর মতে, নতুন যুগের ভারতীয় কতুরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো পছন্দের স্বাধীনতা। কেউ চাইলে গ্লামারাস সাজ বেছে নেবেন, আবার কেউ পরিমিত সৌন্দর্যে নিজেকে প্রকাশ করবেন—দুটোরই সমান জায়গা আছে।
অর্পিতা মেহতার কাছে কোনো কারুশিল্প শুধু জনপ্রিয় বলেই সংগ্রহে জায়গা পায় না। সেটি অবশ্যই সংগ্রহের গল্প এবং ব্র্যান্ডের নিজস্ব নকশা-দর্শনের সঙ্গে মানানসই হতে হবে। সেই কারণেই বেনারসি ও কাঁথা এই সংগ্রহে এসেছে স্বাভাবিকভাবেই, কোনো ট্রেন্ড অনুসরণ করে নয়। ‘সেরিমোনিয়াল’ শুধু অর্পিতা মেহতার প্রথম কতুর সংগ্রহ নয়; এটি এমন এক বার্তা, যা মনে করিয়ে দেয় যে ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ তৈরি হয় তখনই, যখন নতুনত্বের হাত ধরে সম্মানের সঙ্গে এগিয়ে চলে ঐতিহ্য।




