ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সিভিরিদেঙ্কো গতকাল মঙ্গলবার পার্লামেন্টে তার পদত্যাগপত্র জমা দিলে সেটি গ্রহণ করা হয়। দায়িত্বভার গ্রহণের ঠিক এক বছর পূর্ণ হওয়ার পরই এই বিদায়ের ঘটনা ঘটল। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অবশ্য এখন পর্যন্ত নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাকে মনোনীত করবেন, সে বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেননি। এর ফলে এই আকস্মিক মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে বিরোধী আইনপ্রণেতাদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।

চল্লিশ বছর বয়সী এই অর্থনীতিবিদ তার বিদায়ী ভাষণে বলেন, ‘চলতি বছরের প্রতিটি মুহূর্তই কঠোর সিদ্ধান্ত ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপের দাবি রেখেছে। আমাকে সমর্থন ও আস্থার সঙ্গে রাখার জন্য আমি সবার কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আপনারা জানেন, আমি বরাবরই মনে করি— শেষ পর্যন্ত ফলাফলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ সাদা পোশাকে প্রদত্ত সেই ভাষণে তিনি সতর্ক করে দিয়ে যান, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আসন্ন শীতকাল সামাল দেওয়া। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নেটওয়ার্কের ওপর রাশিয়ার হামলা আরও জোরদার হতে পারে।

তবে এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা কারও কাছে স্পষ্ট নয়। বিরোধী আইনপ্রণেতা ওলেক্সি হনচারেঙ্কো সরাসরি মন্তব্য করেন, ‘সরকারকে বিদায় করার সুনির্দিষ্ট কারণ কেউই ব্যাখ্যা করতে পারছে না।’ আরেক বিরোধী সদস্য কিরা রুদিক বলেছেন, নবগঠিত সরকার আগেরটির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন কিছু করবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন না।

সিভিরিদেঙ্কোর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়কালে দেশটিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জড়িত একটি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যদিও তার নিজের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। সমালোচকদের মতে, দুর্নীতি দমনে তিনি যথেষ্ট কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। বিরোধী দল হলোসের আইনপ্রণেতা ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াক বিদায়ী সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের ফলাফলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সরকার সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছে— প্রতিদিন উপস্থাপনা, প্রতিদিন সম্মেলন, আর প্রতিদিনই দুর্নীতির মামলায় একজন নতুন সন্দেহভাজনের নাম।’

আইনপ্রণেতাদের ধারণা, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কোম্পানি নাফতোগ্যাসের প্রধান সেরহি কোরেৎসকিই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে এ বিষয়ে ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে। মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণার পর জেলেনস্কি কোরেৎসকি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যদি ফেদোরভকেও সরানো হয়, তবে সেটিকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হবে। কারণ, চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার আক্রমণের সামর্থ্য বাড়ানোর কৌশলের ওপর কিয়েভ বিশেষ জোর দিচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী প্রধানত দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধকালীন অর্থনীতি পরিচালনা, রুশ আক্রমণে বিধ্বস্ত পরিকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং পশ্চিমা দাতাদের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। সিভিরিদেঙ্কোর কার্যকালে ইউক্রেনকে একটি দুরূহ শীত পার করতে হয়েছে। রাশিয়ার ক্রমাগত হামলায় জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের জন্য বিদ্যুৎ ও উত্তাপের ব্যবস্থা সচল রাখার প্রচেষ্টা চালিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের লক্ষ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনার সূচনাও তার সময়েই হয়েছে।

যুদ্ধাবস্থায় নির্বাচন নিষিদ্ধ থাকায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে জেলেনস্কির হাতে মন্ত্রিসভা রদবদলই মূলত অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু কিয়েভভিত্তিক ইউরোপিয়ান পলিসি ইনস্টিটিউটের নীতিবিষয়ক ফেলো লেসিয়া বিদোচকোর অভিমত, এই ধরনের পুনর্বিন্যাস প্রমাণ করে যে প্রেসিডেন্টকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে এটি কার্যকরী হলেও সময়ের সঙ্গে এর কার্যকারিতা হ্রাস পাচ্ছে। তিনি মন্তব্য করেন, ‘এই রদবদলের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে জেলেনস্কি নতুন মন্ত্রীদের নিয়োগ দেন কি না, তা দিয়ে নয়; বরং তিনি তাদের কার্যকরভাবে কাজ করার উপযোগী পর্যাপ্ত ক্ষমতা অর্পণ করতে প্রস্তুত কি না, সেটির ওপর ভিত্তি করে।’ উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী কয়েকটি মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনেও জেলেনস্কি একই ব্যক্তিদের ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্বে বসিয়েছেন। যেমন, সিভিরিদেঙ্কোর পূর্বসূরি ড্যানিস শিমহাল এক বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগের পর প্রথমে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে জ্বালানিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।