সবুজ পাহাড়বেষ্টিত নয়নাভিরাম ক্যাম্পাসের জন্য সুপরিচিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার একটি পাহাড় কোদালের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। পরিবেশগত ছাড়পত্রের তোয়াক্কা না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তরের জন্য একটি নতুন ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে পাহাড়ের প্রায় ২ শতাংশ জায়গা ইতিমধ্যে সমতল করা হয়েছে।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, পরিবহন দপ্তরের মূল ফটকটি বন্ধ রাখা হয়েছে, যাতে বাইরে থেকে অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম আঁচ করা না যায়। ফটকের পাশ থেকে উঁকি দিলে দৃশ্যমান হয় ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিকের কর্মচঞ্চলতা, একটি এক্সক্যাভেটর এবং ফেলে রাখা চার-পাঁচটি গাছ। প্রায় ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু পাহাড়ের একাংশ ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ সমতল করে ফেলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, গত ১ এপ্রিল এই নির্মাণ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স’ এ নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১১ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে ভবনের একটি অংশ নির্মিত হবে, যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে আনুমানিক ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আগামী বছরের মার্চের মধ্যে এ ধাপের কাজ সমাপ্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপে প্রায় ২২ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে একটি তিনতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও আছে।

তবে, কত সংখ্যক গাছ কাটা হয়েছে বা পাহাড়ের ঠিক কতটুকু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, সে ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়র ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। তার দাবি, এখন পর্যন্ত শুধু পাহাড়ের ঢালে ভেঙে পড়া অংশে কাজ করা হয়েছে।

অথচ, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত) অনুসারে, পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমোতি ব্যতীত কোনো পাহাড় বা টিলা কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জাতীয় স্বার্থে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ছাড়পত্র গ্রহণ করা গেলেও এই আইন সর্বজনীন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জমির উদ্দিন স্পষ্ট ভাষায় জানান, 'দেশের যেকোনো জায়গায় পাহাড় কাটতে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি প্রয়োজন। অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটা হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

চট্টগ্রাম জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের ভবন নির্মাণের বিষয়টি একটি চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছিল। তবে সেই চিঠিতে ভবনের আয়তন পাঁচ হাজার বর্গমিটারের কম উল্লেখ করায় বিষয়টি তাদের অধিক্ষেভুক্ত নয় বলে জানানো হয়। চিঠিতে পাহাড় কাটার কোনো উল্লেখ ছিল না বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, 'পাহাড় কাটার প্রমাণ পাওয়া গেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একটি অংশ এই পাহাড় কাটার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 'আওয়ার গ্রিন ক্যাম্পাস' নামের একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের সভাপতি মো. মোজাহিদুল ইসলামের মত, ভবন নির্মাণের জন্য পাহাড় কাটা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিবেশের ন্যূনতম ক্ষতি সাপেক্ষে বিকল্প জায়গায় ভবন নির্মাণ সম্ভব ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি ও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সমাজসেবা ও পরিবেশ সম্পাদক তাহসিনা রহমান বলেন, 'প্রশাসন শিক্ষার্থীদের মতামত ও পরিবেশগত দিক সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিবহন দপ্তরের নতুন ভবন নিয়ে আমাদের কোনো তথ্যই দেওয়া হয়নি।' প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চি করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান পাহাড় কাটার কথা অস্বীকার করে বলেছেন, 'বিশ্ববিদ্যালয় কোনোভাবেই পাহাড় কাটছে না। খামাত্র কিছু অংশ সমান করা হয়েছে।' পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, 'আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত নই। তবে আমরা খুব বড় ধরনের ক্ষতি করছি না। অধিদপ্তরের প্রক্রিয়ায় গেলে অনেক জটিলতা থাকে, তাই আমরা বিষয়টি নিজেরাই সতর্কতার সাথে নেতৃত্ব দিচ্ছি।'

এদিকে, বিশেষজ্ঞরা এই ধরণের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের এক অধ্যাপক কামাল হোসাইনের মতে, নতুন নির্মাণ কাজে পাহাড়কে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করাই উচিত নয়। তার ভাষ্য, 'চট্টগ্রামের পাহাড়ের মাটি স্বাভাবিকভাবেই অস্থিতিশীল। একবার কাটাছেঁড়া করা হলে বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। উন্নয়ন করতেই হলে তা পাহাড় এড়িয়ে বা প্রাকৃতিক ঢালের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হবে।'