সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নক্ষত্রখ্যাত ব্যক্তিদের জীবন এখন সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা পেয়েছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও লক্ষ লক্ষ ভিউ পেতে পারে, অথচ সেই ক্যামেরাবন্দি মুহূর্তটি পেতে একজন আলোকচিত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। মুম্বাইয়ের প্রখ্যাত পাপারাজ্জি এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে ইন্ডিয়া টুডে জানার চেষ্টা করেছে এই ব্যবসার অন্দরমহলের কথা, যা দর্শকদের চোখে প্রায়ই স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়।

আট বছরের বেশি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পাপারাজ্জি বিশাল জানান, বর্তমানে প্রায় প্রতিটি তারকার নিজস্ব পিআর টিম রয়েছে। তাঁরাই অনেক সময় ফোন করে জানিয়ে দেন কখন, কোথায় তারকাকে পাওয়া যাবে। তবে শুধু ফোনের অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজেদেরও নজরদারি চালাতে হয়। বান্দ্রা, জুহুর মতো এলাকার পাশাপাশি এখন আন্ধেরিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোন তারকা কোন জিমে যান, কখন যান, কোন গাড়িতে চলাফেরা করেন—এসব তথ্যই তাদের কাজের মূল উপকরণ। বিশালের পাঁচ সদস্যের একটি দল রয়েছে, যারা তারকাদের বাড়ির সামনে গাড়ি দেখে তাদের উপস্থিতি আঁচ করার চেষ্টা করে।

কাজটি এখন আর শুধু ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ফোরকে ক্যামেরায় তোলা ক্লোজআপ ফুটেজের চাহিদা বেড়েছে। বিশাল দাবি করেন, এই ধারার পথিকৃৎ তিনি। তবে ফোরকে ক্যামেরার একটি সমস্যা হলো—মুঠোফোনের মতো তৎক্ষণাৎ চালু করা যায় না, ফলে হাতে থাকে মাত্র তিন থেকে পাঁচ সেকেন্ড। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তারকাকে ক্যামেরায় ধরে ফেলতে না পারলে পুরো অপেক্ষাই ব্যর্থ। বৃষ্টি নামলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

মজার বিষয় হলো, ক্যামেরাকে পাত্তা না দেওয়াও এখন একটি ট্রেন্ড। বিশালের মতে, ‘পোজ না দেওয়া’ বা উপেক্ষা করে চলে যাওয়া অপেক্ষাকৃত নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের মধ্যে জনপ্রিয়, কারণ এ ধরনের ভিডিও অনেক সময় বেশি ভিউ পায়। তবে সালমান খানের মতো ব্যতিক্রমও আছে, যিনি এখনও পাপারাজ্জিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পোজ দেন।

পাপারাজ্জিদের আয়ের প্রধান উৎস নির্দিষ্ট বেতন, ইনস্টাগ্রাম প্রচার, ব্র্যান্ড কনটেন্ট এবং পিআর এজেন্সির কাজ। সিনেমার প্রচারও একটি বড় আয়ের খাত। ধর্মা প্রোডাকশনস, টি-সিরিজ, যশরাজ ফিল্মসের মতো সংস্থাগুলো পোস্টার, ট্রেলার ও গানের প্রচারের জন্য অর্থ দেয়। তবে এই ঝলমলে জগতের পেছনে থাকা পাপারাজ্জিদের নিজেদের আয় তেমন ঝলমলে নয়। মুম্বাইয়ে একজন পাপারাজ্জির সর্বোচ্চ মাসিক আয় সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার রুপি, যা বিশালের নিজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার রুপি।

সব ‘ক্যান্ডিড’ ছবি যে কাকতালীয় নয়, তা এই প্রতিবেদনে স্পষ্ট। অনেক সময় পিআর টিম নির্দিষ্ট জায়গায় ডেকে নেয়, আবার কখনও কোনো তথ্যই দেওয়া হয় না। মুম্বাই বিমানবন্দরে দুই শিফটে কাজ করেন পাপারাজ্জিরা। ভূমি পেড়নেকর, শেহনাজ গিল ও অনিল কাপুরের মতো তারকারা কখনও কখনও নিজেরাই খবর দেন। অন্যদিকে, শাহরুখ খান ও আমির খান ক্যামেরা এড়াতে চান। সম্প্রতি লন্ডন থেকে ফেরার সময় শাহরুখ একাধিক দরজার সামনে গাড়ি রেখে অন্য পথে বেরিয়ে গিয়েছিলেন বলে জানান বিশাল।

তারকাদের সন্তানদের ছবি তোলা এই পেশার সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক। দীপিকা-রণবীর, আথিয়া-সুনীল শেঠি এবং রানি মুখার্জির মতো তারকারা শিশুদের ছবি না তোলার অনুরোধ করেছেন বলে জানান পাপারাজ্জি অজয়। এমনকি বিরাট কোহলি উপহার পাঠিয়ে এই অনুরোধ করেছিলেন। এই বিষয়ে আইনি নোটিশ পর্যন্ত গড়াতে পারে।

দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করার ফলে তারকা ও পাপারাজ্জিদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কও গড়ে ওঠে। বরুণ ধাওয়ান ফোন ভেঙে যাওয়ায় বিশালকে নতুন ফোন উপহার দিয়েছেন। সোনাক্ষী সিনহা গাড়ি থামিয়ে পোজ দেন বলেও জানা যায়। তবে জয়া বচ্চনের সঙ্গে সম্পর্ক এখন তিক্ত। তাঁর রাগের ভিডিও ও বাগ্বিতণ্ডার পর পাপারাজ্জিরা সম্মিলিতভাবে তাঁর ছবি না তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি।

অসুস্থতা, মৃত্যু বা শোকের মুহূর্তে ছবি তোলা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়লেও পাপারাজ্জিদের বক্তব্য, তাঁরা শুধু দৃশ্য ধারণ করেন, পরবর্তীতে অন্য পেজগুলো সেগুলোকে ভাইরাল করে। পেছন থেকে ছবি তোলার নতুন ধরনের কনটেন্ট নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা এনগেজমেন্ট বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশালের অভিজ্ঞতায় তারকাসন্তানদের সঙ্গে আচরণ ভালো। নির্বাণ খান, আরহান খান, অগস্ত্য নন্দা ও সুহানা খানকে তিনি ‘খুবই মিষ্টি’ বলে বর্ণনা করেছেন। সমস্যা মূলত ভয়—অনলাইনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ভয় এবং বাবা-মায়ের সতর্কবার্তা।

দর্শকের আচরণের বদলেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। মানুষ এখন তারকাদের দৈনন্দিন জীবনও দেখতে চায়, যার ফলে তারকাদের কাছে পৌঁছানোর অনুভূতিটাই বিক্রি হয়—কখনো সত্যিকারের, কখনো সাজানো, আবার কখনো খুব যত্নে নিয়ন্ত্রিত। এই চার দৃষ্টিভঙ্গির মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের বলিউডের পাপারাজ্জি অর্থনীতি।