ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের আশপাশের এলাকায় এখন অপটিক্যাল ফাইবারের ছড়াছড়ি। ড্রোন নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক যোগাযোগের জন্য মাটির ওপর, গাছে গাছে কিংবা অস্থায়ীভাবে মাইলের পর মাইল এই ফাইবার লাইন বিছানো হয়েছে। যুদ্ধের তাণ্ডবে সেগুলোর বড় অংশ ছিঁড়ে পড়ছে এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে। যুদ্ধের কারণে প্রাকৃতিক উপাদান যেমন খড়কুটো, শুকনা ঘাস, গাছের ডাল বা পাতার সহজলভ্যতা কমে যাওয়ায় পাখিরা চারপাশে পড়ে থাকা অপটিক্যাল ফাইবার সংগ্রহ করে বাসা বানাতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি পাখিদের একধরনের 'শহুরে অভিযোজন' বা আরবান অ্যাডাপ্টেশন। ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইনের দেওয়া অভিযোজন তত্ত্বের আলোকে দেখা গেলে, পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ এটি। তবে এই অভিযোজন পাখিদের জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হতে পারে। অপটিক্যাল ফাইবারের ভেতরের সূক্ষ্ম সিলিকা বা কাচের তন্তু ছানাদের চোখ ও শরীরে ফুটে গুরুতর অভ্যন্তরীণ ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। এই বাসাগুলো প্রাকৃতিক উপাদানের মতো তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে না, ফলে শীতে অতিরিক্ত ঠান্ডা আর গ্রীষ্মে উত্তপ্ত হয়ে ডিম ও বাচ্চা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া জট পাকানো তারে ডানা বা পা আটকে অনেক পাখি বাসা থেকে বের হতে না পেরে না খেয়ে বা শ্বাসরোধে মারা যেতে পারে। ফাইবারের প্লাস্টিক আবরণ মুখে নেওয়ার কারণে পাখিদের শরীরে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের প্রজননক্ষমতা ধ্বংস করতে পারে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রযুক্তির বর্জ্য দিয়ে পাখির বাসা বানানোর ঘটনা নতুন নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের ট্রেঞ্চে সামরিক টেলিগ্রাফ ও টেলিফোনের তামার তার বিছানো হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে সেই তামার তারের বর্জ্য দিয়ে আমেরিকান রবিন পাখির মতো প্রজাতি বাসা বানিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সামরিক রাডার স্টেশন ও সিগন্যাল টাওয়ারের আশপাশেও তারের বর্জ্য তৈরি হয়েছিল। চিলির কিছু অঞ্চলে কোয়াটকারো (কাঠঠোকরার প্রজাতি) এবং ইউরোপের নাইটিঙ্গেল (বুলবুলি) পাখি পরিত্যক্ত নাইলন ও ফাইবার গ্লাসের তার দিয়ে বাসা বানাতে শুরু করেছিল। এই ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে মানবসৃষ্ট ধ্বংসলীলার মধ্যেও প্রকৃতির বেঁচে থাকার লড়াই চিরকালীন। কিন্তু অপটিক্যাল ফাইবারের তৈরি পাখির বাসাগুলো শুধু পাখিদের জন্যই নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্যই এক উদ্বেগজনক সংকেত। মানুষের যুদ্ধ কীভাবে বন্য প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও আচরণকে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে, তারই নীরব দলিল এই বাসাগুলো। এখনই প্রয়োজন দায়িত্বশীল পদক্ষেপ, যাতে প্রকৃতির এই সংকট আরও গভীর না হয়।
যুদ্ধের ছোঁয়ায় পাখিদের বাসা তৈরির পদ্ধতি বদলে দিচ্ছে অপটিক্যাল ফাইবার
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে ফ্রন্টলাইনে পাখিরা প্রাকৃতিক উপাদানের বদলে অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে বাসা বানাচ্ছে। এটি ডারউইনের অভিযোজন তত্ত্বের বাস্তব উদাহরণ হলেও পাখিদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।




