ভারতীয় ফুটবল এখন এক অদ্ভুত সংকটের মুখে। একদিকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বা রাফিনিয়ার মতো তারকাদের বিপক্ষে খেলার বিরল সুযোগ, অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দলের বিপক্ষে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ—কোনটিকে প্রাধান্য দেবে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন? আগামী ৩ অক্টোবর কলকাতায় ব্রাজিলের বিপক্ষে মাঠে নামার কথা ভারতের। একই সময়ে ইন্দোনেশিয়ায় প্রথমবারের মতো আয়োজিত হতে যাচ্ছে ফিফা আশিয়ান কাপ, যেখানে অংশ নেবে ভারতও। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর চলা এই টুর্নামেন্টে ভারতের প্রতিপক্ষ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। দুই প্রতিযোগিতার সময়সূচি একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় আলাদা দল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। বৃহস্পতিবার নির্বাহী কমিটির বৈঠকের পর জানানো হয়েছে, দুটি প্রতিযোগিতাতেই অংশগ্রহণের কথা ফিফাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে তারা।
এর আগে বহুদিন ধরে অভিযোগ ছিল, জাতীয় দল পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলার সুযোগ পায় না, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজেদের পরীক্ষা করার মতো পরিবেশ নেই। গত বছর ভারত খেলেছিল মাত্র ১০টি ম্যাচ। এবার সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের আন্তর্জাতিক উইন্ডোতেই হাতে এসেছে চার-পাঁচটি ম্যাচের সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগই এখন ভারতীয় ফুটবলের জন্য তৈরি করেছে নতুন ধাঁধা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এ বিষয়ে সাবেক কোচ ও খেলোয়াড়দের মতামত নিয়েছে। বেশিরভাগই ব্রাজিল ম্যাচের বদলে আশিয়ান কাপকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। সাবেক এফসি পুনে সিটি কোচ প্রদ্যুম রেড্ডি ব্রাজিল ম্যাচকে 'নিরর্থক' বলেছেন। তাঁর মতে, বহু বছর ধরে ভারত সাফ কাপের বাইরে গিয়ে এশিয়ার মধ্যম সারির দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগ খুঁজছে; এবার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দলের বিপক্ষে সেই সুযোগ এসেছে। তাই সেটিকে উপেক্ষা করে ব্রাজিলের দিকে ছোটা বোকামি হবে।
মোহনবাগানকে আই-লিগ জেতানো সঞ্জয় সেনও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ থেকে ভারতের লাভ কী? অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আশিয়ান কাপ; সেখানে ইন্দোনেশিয়ার মতো দলকে হারাতে পারলে উন্নতির প্রমাণ পাওয়া যাবে। সাবেক ভারতীয় ডিফেন্ডার মেহরাজউদ্দিন ওয়াদুও ফিফা আশিয়ান কাপকে শতভাগ অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে। তাঁর যুক্তি, এই টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ, শিরোপা জেতার সম্ভাবনা, পুরস্কারের অর্থ এবং দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগার মতো অভিজ্ঞতা রয়েছে। যদিও ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ সমর্থকদের জন্য রোমাঞ্চকর, ফুটবলের উন্নতির বিচারে সেটি অগ্রাধিকার পাওয়ার মতো নয় বলে মনে করছেন তিনি।
তবে সবাই যে ব্রাজিল ম্যাচ বাতিলের পক্ষে, তা নয়। সাবেক ভারতীয় খেলোয়াড় ও ইন্ডিয়ান অ্যারোজের কোচ ফ্লয়েড পিন্টো একে দেখছেন জীবনে একবার আসা সুযোগ হিসেবে। তাঁর মতে, কোনো সিনিয়র খেলোয়াড়ই ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো তারকার বিপক্ষে খেলতে চাইবে না। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, আশিয়ান কাপে তরুণদের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
বিষয়টি শুধু পছন্দের নয়, নিয়মেরও। ফিফার আয়োজিত প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় সারির দল পাঠানো কতটা সম্ভব, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাবেক এআইএফএফ মহাসচিব শাজি প্রভাকরণ জানিয়েছেন, ফিফার প্রতিযোগিতায় সাধারণত 'এ' দল পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকে; প্রতিযোগিতার মর্যাদা ও স্বচ্ছতা রক্ষায় এমন ব্যবস্থাই অনুসরণ করে ফিফা। ভারত তো এমনিতেই দুটি শক্তিশালী 'এ' দল গঠন করতে পারে না। ফলে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ভবিষ্যতের জন্য কোন সুযোগটি বেশি মূল্যবান। যে ম্যাচ এক সময় ভারতীয় ফুটবলের জন্য ছিল স্বপ্নের, সেটিই এখন তাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।




