বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ সম্প্রতি এশিয়ান সায়েন্টিস্ট ম্যাগাজিন প্রকাশিত এশিয়ার শীর্ষ ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এটি তাঁর দীর্ঘ গবেষণাজীবনের আরেকটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এর আগে টাইম সাময়িকী ২০২৫ সালে তাঁকে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তি’র তালিকায় রেখেছিল।
চার দশক আগে চিকিৎসক হিসেবে পেশা শুরু করার পর থেকেই ড. তাহমিদ দেখেছেন, বাংলাদেশে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের মধ্যে অপুষ্টি একটি বড় সংকট। বিশেষ করে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি সুস্থ শিশুর তুলনায় ১২ গুণ বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই বাস্তবতা তাঁকে অপুষ্টির চিকিৎসায় নতুন পথ খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করে। প্রচলিত চিকিৎসায় পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হলেও অনেক শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয় না—এই ধাঁধা সমাধান করতেই তাঁর গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু গড়ে ওঠে।
তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্থানীয় উপাদান—যেমন কাঁচা কলা, ছোলা, সয়াবিন, চিনাবাদাম ও চাল—ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে ‘স্বর্ণালি’ নামের একটি বিশেষ খাদ্য। এই খাবারটি তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য অল্প পরিমাণেই পর্যাপ্ত আমিষ, শর্করা, চর্বি ও অনুপুষ্টি সরবরাহ করে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে পরিচালিত বড় পরিসরের গবেষণায় স্বর্ণালির কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। ড. তাহমিদ বলেন, ‘আমরা চেয়েছি দেশীয় উপাদান দিয়েই এমন খাবার তৈরি করতে যা এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে শিশুকে তীব্র অপুষ্টি থেকে বের করে আনবে।’ স্বর্ণালির দুটি রূপ রয়েছে: একটি চাল ও ডাল দিয়ে তৈরি, অন্যটি ছোলা দিয়ে যা প্রায় হালুয়ার মতো।
তবে ড. তাহমিদের সবচেয়ে আলোচিত গবেষণা শুরু হয় অন্ত্রের অণুজীব বা গাট মাইক্রোবায়োম নিয়ে। তিনি ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইসের অধ্যাপক জেফ্রি গর্ডনের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় দেখেন, অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের অন্ত্রে ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতি পুষ্টি শোষণে বাধা সৃষ্টি করে। মিরপুরের বস্তি ও কুড়িগ্রামের কিছু অঞ্চলে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির অভাবে শিশুদের অন্ত্রে প্রদাহ তৈরি হয়। ফলে পুষ্টিকর খাবার ঠিকমতো কাজ করে না।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখে ড. তাহমিদ ও ড. গর্ডনের দল তৈরি করেন ‘মাইক্রোবায়োটা-ডিরেক্টেড কমপ্লিমেন্টারি ফুড-২’ বা এমডিসিএফ-২। এটি সরাসরি ব্যাকটেরিয়া না দিয়ে অন্ত্রে আগে থেকে থাকা উপকারী অণুজীবের বৃদ্ধি ঘটায়। ছোলার আটা, সয়াবিনের আটা, চিনাবাদামের পেস্ট ও কাঁচা কলার মতো উপাদান দিয়ে তৈরি এই খাদ্যের কার্যকারিতা বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৯ সালে ‘সায়েন্স’, ২০২১ সালে ‘দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’ এবং পরবর্তীতে ‘নেচার’–এ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। চিকিৎসা শেষ হওয়ার দুই বছর পরও শিশুদের বৃদ্ধিতে এর ইতিবাচক প্রভাব টিকে থাকতে দেখা গেছে।
বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, মালি ও তানজানিয়ায় এমডিসিএফ-২-এর বড় পরিসরের আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। সফল হলে এটি বিভিন্ন দেশের সরকার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। প্রচলিত প্রোবায়োটিকের মতো নয়—এটি বাইরে থেকে ব্যাকটেরিয়া না এনে অন্ত্রের নিজস্ব ব্যাকটেরিয়ার জন্যই খাদ্য সরবরাহ করে, যা শরীরের বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করে।
আইসিডিডিআরবির মহাখালী ক্যাম্পাসে ড. তাহমিদের গবেষণা দল নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠান ইতোপূর্বে ওরস্যালাইনের মতো যুগান্তকারী উদ্ভাবন এনেছে। তাদের পুষ্টি পুনর্বাসন ইউনিটে চিকিৎসা নেওয়া শিশুদের মায়েরা স্থানীয় উপাদানের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন। ড. তাহমিদের গবেষণার সবচেয়ে বড় শিক্ষা—বিশ্বমানের বিজ্ঞান সব সময় উন্নত দেশের গবেষণাগারে জন্মায় না, বরং স্থানীয় বাস্তবতা ও সহজলভ্য উপাদান দিয়েও তা সম্ভব। এশিয়ান সায়েন্টিস্ট তাঁকে ‘খর্বকৃতি, অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলা বিজ্ঞানী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।




