আজ ২৮ জুলাই, মানব ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক সংঘাত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ১১২তম বার্ষিকী। ১৯১৪ সালের এই দিনে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল চার বছরব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী লড়াই, যার বলি হয়েছিল লাখ লাখ মানুষ।
এই যুদ্ধের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল অস্ট্রিয়ার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও তার স্ত্রী সোফির হত্যাকাণ্ড। ১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে রাষ্ট্রীয় সফরের সময় ১৯ বছর বয়সী বসনিয়ান সার্ব গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ তাদের গুলি করে হত্যা করে। প্রিন্সিপ পরে জানায়, দেশপ্রেম ও স্লাভ জনগণকে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় নিপীড়ন থেকে মুক্ত করতেই সে এই হত্যা চালিয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তার বয়স ২০ বছরের কম হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়; ১৯১৮ সালে কারাগারে যক্ষ্মায় তার মৃত্যু হয়।
ফার্দিনান্দকে কেন লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, তার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য ১৯০৮ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে নিজেদের সাথে যুক্ত করে। এই অঞ্চলের কাঠের সম্পদ লুট করে নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়দের কোনো সুবিধা না দেওয়ায় সার্ব জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে ক্ষোভ জন্মে। তারা বলকানের সব স্লাভ জনগোষ্ঠী নিয়ে গ্রেটার সার্বিয়া গঠনের স্বপ্ন দেখত। তাই সারায়েভোতে যুবরাজের সফরকে অনেক জাতীয়তাবাদী তরুণ অপমানজনক মনে করে এবং তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলো দুটি বড় সামরিক জোট গঠন করেছিল। একদিকে ছিল ট্রিপল অ্যালায়েন্স (কেন্দ্রীয় শক্তি) — জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া ও উসমানীয় সাম্রাজ্য। অন্যদিকে ছিল ট্রিপল আন্তঁত (মিত্রশক্তি) — ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ইতালি, জাপান ও পরে যুক্তরাষ্ট্র। জোটের শর্ত অনুযায়ী, কোনো সদস্য যুদ্ধে জড়ালে বাকিরাও তার পক্ষ নেবে।
হত্যাকাণ্ডের পর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফ সার্বিয়াকে দায়ী করে ২৩ জুলাই কঠোর দাবি জানান। সার্বিয়া অধিকাংশ দাবি মেনে নিলেও নিজেদের বিচারব্যবস্থায় বিদেশি তদারকির শর্ত প্রত্যাখ্যান করে। রাশিয়ার সমর্থনে আত্মবিশ্বাসী ছিল তারা। অন্যদিকে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি জার্মানির সমর্থন পাবে বলে ভরসা পেয়েছিল। ইউনিভার্সিটি অ্যাট অ্যালবানির ইতিহাসবিদ রিচার্ড ফোগার্টি মনে করেন, উভয় পক্ষই ভেবেছিল মিত্রদের উপস্থিতি যুদ্ধ প্রতিরোধ করবে, কিন্তু বাস্তবে তা উল্টো ফল দেয়।
সার্বিয়া সব দাবি না মানায় ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি যুদ্ধ ঘোষণা করে। দেড় সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। রাশিয়া সার্বিয়ার পক্ষে নামে, জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তারপর বেলজিয়ামে হামলা চালায়। বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া যুক্তরাজ্য জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়। ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে নামলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
চার বছর ধরে চলে এই ভয়াবহ যুদ্ধ। ১৯১৮ সালের অক্টোবরে জার্মানির কিল বন্দরে নাবিকদের বিদ্রোহ ও দেশজুড়ে খাদ্যসংকটের কারণে ধর্মঘট শুরু হয়। ৯ নভেম্বর জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেম সিংহাসন ত্যাগ করে নেদারল্যান্ডসে পালিয়ে যান। নতুন সরকার ফ্রিডরিখ এবার্টের নেতৃত্বে গঠিত হয় এবং মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। ১১ নভেম্বর ১৯১৮ সালে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের তৈরি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে জার্মানি সই করে; স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র বদলে যায়। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়, উসমানীয় ও রোমানভ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়, এবং ইউরোপে সাম্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে। ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তিতে যুদ্ধের জন্য মূলত জার্মানিকে দায়ী করা হয়। ইতিহাসবিদ রিচার্ড ফোগার্টির মতে, যুদ্ধ শেষে সবাই একটাই প্রশ্ন করেছিল—এত বড় যুদ্ধ কীভাবে শুরু হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, সামরিক জোট, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ একসঙ্গে মিলে এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্ম দিয়েছিল।




