গ্রামীণ জনপদ থেকে কাজের সন্ধানে শহর বা বিদেশে পাড়ি জমানো তরুণদের পেছনে শুধু অভাব নয়, বরং শিক্ষা ও শারীরিক সক্ষমতাও বড় ভূমিকা রাখে বলে উঠে এসেছে এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিংহামটন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা যৌথভাবে পরিচালিত এই গবেষণায় ২১ বছর ধরে (১৯৯৬-২০১৭) চাঁদপুরের মতলব এলাকার ৩ হাজার ৭৫৬ তরুণ-তরুণীর (বয়স ১৮-৩৪ বছর) স্বাস্থ্য ও অভিবাসনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। বিজ্ঞান সাময়িকী হেলিওনে ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।

গবেষণায় শারীরিক অবস্থা বিচারের জন্য তিনটি মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে—দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা (গত ১২ মাসের তথ্য), তীব্র বা সাময়িক অসুস্থতা (গত ১ মাসের তথ্য) এবং ব্যক্তির নিজের দৃষ্টিতে তার স্বাস্থ্য কেমন (সেলফ-রেটেড হেলথ)। ফলাফলে দেখা গেছে, যাদের কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা (যেমন দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা দুর্বলতা) নেই, তাদের তুলনায় অসুস্থ ব্যক্তিদের এলাকা ছাড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। যাদের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা আছে, তাদের অভিবাসনের সম্ভাবনা সুস্থদের চেয়ে ১৮ শতাংশ কম, আর যাদের দুই বা ততোধিক স্বাস্থ্য সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই হার ২৭ শতাংশ কম। তবে জ্বর-কাশি বা ডায়রিয়ার মতো সাময়িক অসুস্থতা অভিবাসনের সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রভাব ফেলে না। মূলত দীর্ঘস্থায়ী রোগই মানুষকে শারীরিকভাবে অযোগ্য ও আত্মবিশ্বাসহীন করে তোলে, ফলে তিনি অজানার উদ্দেশে পাড়ি জমানোর ঝুঁকি নিতে চান না।

অভিবাসনের ক্ষেত্রে পুরুষের হার (৫৭ শতাংশ) নারীর (৩১ দশমিক ৫ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি। পুরুষেরা মূলত অর্থনৈতিক কারণে ঘর ছাড়েন, আর নারীদের ক্ষেত্রে বড় কারণ বিয়ে। শিক্ষার প্রভাব এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট—যারা উচ্চশিক্ষিত, তাদের মধ্যে গ্রাম ছেড়ে শহরে বা বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি অভিবাসী হন। ধর্মীয় পরিচয়ের দিক থেকে মুসলিমদের মধ্যে অভিবাসনের হার হিন্দুদের তুলনায় কিছুটা বেশি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পারিবারিক সম্পদের পরিমাণ যাদের বেশি, তাদের আন্তর্জাতিক অভিবাসনের হারও বেশি, যা থেকে বোঝা যায় খরচ মেটানোর সক্ষমতা অভিবাসন প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখে।

গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষার স্তরের সঙ্গে গ্রাম থেকে বাইরে যাওয়ার সম্পর্ক গভীর। যারা কোনো দিন স্কুলে যাননি বা প্রাথমিক স্তরেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন, তাদের তুলনায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এলাকা ছাড়ার প্রবণতা অনেক বেশি। শিক্ষার প্রতিটি অতিরিক্ত বছর একজন তরুণের অভিবাসনের সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। গবেষকদের মতে, এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করে—উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক সচলতা ও তথ্যের সহজলভ্যতা।

আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী মো. মঈনউদ্দিন হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, 'আমরা দেখেছি, সম্ভাবনাময় তরুণদের একটি বড় অংশ শহর ও বিদেশে উন্নত শিক্ষা ও ভালো কাজের জন্য চলে যাচ্ছে। এই নীরব প্রস্থান ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে গ্রামীণ জীবন—মেধা ও সক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে আর কমে যাচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা মানুষের সংখ্যা।' যদিও প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) পরিবারের সচ্ছলতা ফেরায়, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে মেধার এই 'বহিঃপ্রবাহ' দীর্ঘ মেয়াদে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একধরনের শূন্যতা তৈরি করছে।

গবেষণার তথ্যের সঙ্গে মিল আছে মতলব দক্ষিণ উপজেলার নওগাঁও গ্রামের মজিবুল হকের পরিবারের ঘটনার। মজিবুল কাজ করতেন বাংলাদেশ রেলওয়েতে। তাঁর আট ছেলে, সবাই উচ্চশিক্ষিত—প্রকৌশলী, চিকিৎসক, জজ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, উকিল—কেউই গ্রামে থাকেন না। একজন থাকেন মতলব পৌরসভা এলাকায়, বাকিরা ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে। গ্রামের সঙ্গে তাঁদের কারও যোগাযোগ নেই।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, গবেষণার এই তথ্য ঠিক যে ধনী, শিক্ষিত ও সুস্থদের মধ্যে অভিবাসন বেশি। তবে প্রবাসী আয় বা শহর থেকে পাঠানো অর্থ গ্রামে বা পরিবারের অবস্থা ফেরায়। আবার কিছু নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও দরিদ্রদের অভিবাসনে বাধ্য করে। নীতিনির্ধারণে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।