রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবিসংবলিত একটি বিলবোর্ড টাঙানো নিয়ে ক্যাম্পাসে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গত শুক্রবার ‘নভোকালচার’ নামক একটি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শিরোনামের এই বিলবোর্ডটি স্থাপন করা হয়। প্ল্যাটফর্মটির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার।

প্যারিস রোডে টাঙানো বিলবোর্ডটিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের ছবি স্থান পেয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও মীর কাসেম আলী। এছাড়া শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় দণ্ডিত মেজর (অব.) বজলুল হুদার ছবিও বিলবোর্ডে রাখা হয়েছে। ছবির নিচে লেখা হয়েছে, ‘জেলখানায় ফাঁসির নামে বজলুল হুদাকে হাসিনা নিজে জবাই করে।’ বিলবোর্ডে বিচার চলাকালে নিখোঁজ সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী ও বিচারপতি মানিক মিয়ার ছবিও রয়েছে।

বিলবোর্ডটি ‘বিচারিক হত্যার’ শিকার হিসেবে দণ্ডিতদের উপস্থাপন করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায়কে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থী আপন রায় ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রমাণিত ইতিহাসের বিরুদ্ধে কিছু প্রতিষ্ঠা করতে গেলে প্রমাণ দ্বারাই সেটা করতে হবে। “জুডিশিয়াল কিলিং” শব্দটি আপত্তিকর। যতক্ষণ না আইন-সাক্ষী-বিচার দ্বারা প্রমাণ করা যায় তারা যুদ্ধাপরাধী বা রাজাকার ছিলেন না, ততক্ষণ এটি বাংলাদেশের আইনানুসারে অপরাধ।’

আজ রোববার বিকেলে একদল শিক্ষার্থী বিলবোর্ড অপসারণের দাবিতে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নেন। রাত পৌনে আটটা পর্যন্ত তারা অবস্থান চালিয়ে যান। পরে তারা প্রক্টর কার্যালয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, ‘১৯৭১ সালে আল-বদর ও রাজাকার বাহিনীর চিহ্নিত সদস্যদের আমরা ঘৃণাভরে স্মরণ করি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন বা তাদের ঘিরে বিতর্কিত ন্যারেটিভ তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়।’

অন্যদিকে বিলবোর্ডের পক্ষেও যুক্তি দিয়েছেন কিছু শিক্ষার্থী। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘প্রক্টরিয়াল বডি ছবি সরানো নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। প্রক্টর স্যার দুই ঘণ্টা সময় চেয়েছেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, রাজাকারদের চিহ্ন ক্যাম্পাস থেকে নিশ্চিত তবেই ঘরে ফিরব।’

বিলবোর্ড টানানোর বিষয়ে নভোকালচারের পরিচালক সালাউদ্দিন আম্মার মুঠোফোনে কল পাওয়ার পর মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকার কথা জানান। তবে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘ওই নেতাদের মধ্যে কাউকে নিয়ে বিতর্ক বা প্রশ্ন থাকতেই পারে। বিলবোর্ডের মূল বিষয় “জুডিশিয়াল কিলিং” অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নটি তুলে ধরা হয়েছে। শুধু ছবি দেখে পুরো বিষয়টি বিচার করলে উদ্দেশ্য বোঝা যাবে না। শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, খুন, আয়নাঘর, শাপলা হত্যাকাণ্ড এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সেই সব প্রেক্ষাপটেই বিলবোর্ডগুলো তৈরি করা হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান জানান, ‘একদল শিক্ষার্থী বিলবোর্ডটি সরানোর দাবি করেছেন। আবার আরেক দল শিক্ষার্থী বিলবোর্ডটি লাগানোর পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। যার যার যুক্তি তার তার কাছে থাকুক। যেসব বিষয়ে মনোমালিন্য তৈরি হয়, আমরা সেসব বিষয় থেকে বিরত থাকতে চাই। বিলবোর্ডটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। দেখা যাক, কী হয়।’