উরুগুয়ের জাতীয় দলের দায়িত্ব সাময়িকভাবে নিয়েছেন দিয়েগো ফোরলান। গত পরশু মন্টেভিডিওতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে নতুন দায়িত্বে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তার বাবা পাবলো ফোরলানও, যিনি নিজেও উরুগুয়ের হয়ে দুটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। তবে এই পরিবারের ফুটবল প্রতিভার সূচনা কিন্তু এই দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফোরলানের নানা ও পাবলোর শ্বশুর হুয়ান কার্লোস কোরাজ্জোও ছিলেন উরুগুয়ের একজন খ্যাতনামা ফুটবলার। ফলে তিন প্রজন্মের ফুটবল-ঐতিহ্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই পরিবার।
গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে আর্জেন্টিনার ক্লাব ইন্দিপেন্দিয়েন্তের হয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছিলেন হুয়ান কার্লোস কোরাজ্জো। তবে দেশের জার্সিতে তার খেলা হয়েছিল খুবই কম। ১৯২৮ সালে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলার পর জাতীয় দল থেকে বাদ পড়েন এই মিডফিল্ডার। সেসময় আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের সংখ্যাও ছিল হাতে গোনা, আর বিশ্বকাপের যাত্রা তখন সবে শুরু। খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে খেলতে না পারার আক্ষেপ কোরাজ্জো পূরণ করেন কোচ হিসেবে। তার নেতৃত্বেই ১৯৬২ বিশ্বকাপে অংশ নেয় উরুগুয়ে, যদিও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় দলটিকে। তবে এতেই থেমে থাকেননি তিনি; ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের পর বিরতি দেন, পরে আবারও ফিরে আসেন। তার অধীনেই ১৯৬৭ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে উরুগুয়ে। সেই সময় টানা ১৪ ম্যাচ অপরাজিত থেকে নতুন রেকর্ডও গড়েছিল দলটি, যা ২০১২ সালে অস্কার তাবারেজের অধীনে টানা ১৮ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ভাঙে। ১৯৮৬ সালে মৃত্যু হয় কোরাজ্জোর, তবে ততদিনে এই পরিবারে যুক্ত হয়ে গেছেন আরেক উজ্জ্বল ফুটবলার।
শ্বশুরের পথ ধরেই ফুটবলে আসা পাবলো ফোরলান দীর্ঘদিন উরুগুয়ের হয়ে খেলেছেন। যদিও ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে কোরাজ্জো কোচ ছিলেন না, ফলে শ্বশুরের অধীনে খেলার সুযোগ হয়নি তার। তবে ১৯৭৪ বিশ্বকাপে উরুগুয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন পাবলো। পেনারল, সাও পাওলো, ক্রুজেইরো ও নাসিওনালের মতো দলে খেলা এই ডিফেন্ডার উরুগুয়ে ও ব্রাজিল— দুই দেশের ফুটবলে শিরোপা জিতেছেন। ক্লাব ফুটবলে নিজের শেষ ট্রফিটি জেতার মাত্র দুই বছর আগে জন্ম নেন তার ছেলে দিয়েগো ফোরলান। সন্দেহাতীতভাবে তিনিই এই পরিবারের সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকা।
শুধু উরুগুয়েই নয়, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে উজ্জ্বল নাম দিয়েগো ফোরলান। পেনারলের একাডেমি থেকে ক্যারিয়ার শুরু করে তিনি খেলেছেন ইন্দিপেন্দিয়েন্তে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ভিয়ারিয়াল, আতলেতিকো মাদ্রিদ ও ইন্টার মিলানের মতো ক্লাবে। স্পেনের লা লিগায় পিচিচি ট্রফি জিতেছেন দুবার— একবার ভিয়ারিয়াল ও অন্যটি আতলেতিকো মাদ্রিদের হয়ে। সেই দুই মৌসুমেই ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শুও অর্জন করেন তিনি। ২০১০ বিশ্বকাপ ছিল তার জন্য স্বপ্নের মতো। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জার্মানির কাছে ৩-২ গোলে হারলেও ওই টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল জেতেন ফোরলান। যুগ্ম সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাবও ছিল তার দখলে, আর জার্মানির বিপক্ষে তার দুর্দান্ত ভলি গোলটি টুর্নামেন্টের সেরা গোলের পুরস্কারও পায়।
মোট তিনটি বিশ্বকাপ খেলা ফোরলান উরুগুয়ের হয়ে ১১২ ম্যাচে করেছেন ৩৬ গোল। ২০১১ সাল থেকে দেশের জার্সিতে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডটি তার নামেই ছিল, যা পরে নিজের করে নেন লুইস সুয়ারেজ। ৪৭ বছর বয়সী এই সাবেক ফরোয়ার্ড এখন তিন পুত্র ও এক কন্যার বাবা। এই পরিবারের ফুটবল-ঐতিহ্য চতুর্থ প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছাবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।




