দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশে—বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভারত—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে বড় ধরনের গণ-আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। এই আন্দোলনগুলোর সূত্রপাত ও গতিপ্রকৃতি ভিন্ন হলেও এগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো সুশাসনের ঘাটতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ক্ষোভ।

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ‘আরাগালায়া’ নামে পরিচিত আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক দুর্দশা। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে রাষ্ট্রীয় নিয়োগে কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ‘গণ-অভ্যুত্থানে’ রূপ নেয়। নেপালে ২০২৫ সালে শাসকদের দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ তছরুপের অভিযোগে ‘জেন-জি অভ্যুত্থান’ সংঘটিত হয়। সর্বশেষ, চলতি বছরের জুলাই মাসে ভারতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ‘ককরোচ’ নামে পরিচিতি লাভ করে, যার ট্রিগার ছিল প্রধান বিচারপতির যুবকদের নিয়ে একটি বিতর্কিত মন্তব্য।

চার দেশের আন্দোলনের ফলাফল ছিল ভিন্ন। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে ২০২২ সালের জুলাইয়ে দেশত্যাগ করেন এবং নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করে সামরিক গ্যারিসনে আশ্রয় নেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান। ভারতের আন্দোলন অবশ্য সরকার ফেলে দেওয়ার লক্ষ্য না থাকলেও, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ আদায়ে সক্ষম হয়।

তিন দেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেগুলো আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত রাজাপক্ষে পরিবারের প্রতিনিধি নমল রাজাপক্ষে মাত্র দুই শতাংশ ভোট পেয়েছেন। নেপালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলি নিজ আসনে মাত্র এক-চতুর্থাংশ ভোট পেয়ে ৩৬ বছর বয়সী বালেন শাহের কাছে পরাজিত হন। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ভাগ্যনির্ধারণের সুযোগ জনগণকে দেওয়া হয়নি।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা সবচেয়ে এগিয়ে। দেশটি সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং গত বছর জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে পাঁচ শতাংশ। বাংলাদেশেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংক খাতকে দেউলিয়া অবস্থা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। তবে রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তিন দেশেই অগ্রগতি সীমিত। শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও তামিল এলাকার স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি এখনো অমীমাংসিত। বাংলাদেশে ১১টি খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও সেগুলোর সুপারিশের সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে। নেপালের নতুন সরকার প্রথম দিনই ১০০ দফা সংস্কার এজেন্ডা ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ছয়টি।

বিদেশনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। তিন দেশের সরকারই চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে আবদ্ধ হলেও, শ্রীলঙ্কা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের যোদ্ধাদের নিজ ভূখণ্ডে নামতে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। নেপালের নতুন সরকার সীমান্ত নিয়ে চীন ও ভারত উভয়ের সঙ্গেই সাহসী আলোচনা করছে।

সব মিলিয়ে, দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলনগুলো রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এখনো বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেনি। তবে সমস্যা শনাক্ত করতে পারা এবং পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে ফাটল ধরানোকে বিশ্লেষকেরা একটি অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। প্রযুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে একটি দক্ষিণ এশীয় গণতান্ত্রিক অক্ষশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পথে রয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলছে।