বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে জেনারেটিভ এআই এবং বড় ভাষা মডেলের (এলএলএম) সহজলভ্যতার কারণে লাখ লাখ মানুষ ২৪/৭ এআই-এর মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ নিচ্ছেন। তবে এআই-এর এই ব্যবহার কতটা কার্যকর এবং নিরাপদ, তা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি কাজে লাগানো যেতে পারে — যা 'ন্যূনতম ক্লিনিক্যাল গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য' বা এমসিআইডি নামে পরিচিত।
এমসিআইডি পদ্ধতিটি ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে উদ্ভাবিত হয়। এর মূল ধারণা হলো, কোনো রোগীর চিকিৎসায় উন্নতি হয়েছে কিনা তা বোঝার জন্য শুধু ক্লিনিক্যাল পরিমাপ নয়, বরং রোগী নিজে কতটা উন্নতি অনুভব করছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ, একজন রোগীর জ্বর কমতে পারে, কিন্তু তিনি যদি এখনও অসুস্থ বোধ করেন, তাহলে প্রকৃত উন্নতি হয়েছে বলা যায় না। এই পদ্ধতি রোগীর দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নতির ন্যূনতম স্তর নির্ধারণ করে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এমসিআইডি প্রয়োগের জন্য বহুল ব্যবহৃত একটি সরঞ্জাম হলো পিএইচকিউ-৯ প্রশ্নমালা। এটি একটি প্রমিত রোগী স্বাস্থ্য প্রশ্নমালা, যাতে নয়টি প্রশ্ন থাকে এবং প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ০ থেকে ৩ স্কেলে দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ স্কোর ২৭। সাধারণত স্কোর ৫-৯ হলে হালকা, ১০-১৪ হলে মাঝারি, ১৫-১৯ হলে মাঝারি থেকে গুরুতর এবং ২০-২৭ হলে গুরুতর বিষণ্নতা নির্দেশ করে। বিশেষ করে নবম প্রশ্নে আত্মহানির চিন্তা থাকলে দ্রুত ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এআই এই পিএইচকিউ-৯ প্রশ্নমালা পরিচালনা এবং স্কোর নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে। তবে এআই যদি স্কোরের ব্যাখ্যা নিজে দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তা বিতর্কিত হয়ে ওঠে। অনেক থেরাপিস্ট মনে করেন, এআই-এর ব্যাখ্যা রোগীকে বিভ্রান্ত করতে পারে, কারণ সাধারণ মানুষ এআই-কে কর্তৃপক্ষ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন, সতর্কতা সহকারে ব্যবহার করলে এআই-এর ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
একটি উদাহরণ দেখা যাক। ধরুন, কেউ সাপ্তাহিক পিএইচকিউ-৯ পরীক্ষা করাচ্ছেন। প্রথম সপ্তাহে তার স্কোর ১৮, দ্বিতীয় সপ্তাহে ১৬ এবং তৃতীয় সপ্তাহে ১৫। একজন সাধারণ এলএলএম (যেমন চ্যাটজিপিটি) দেখাতে পারে যে এক পয়েন্ট কমেছে, তবে বেশিরভাগ মানুষ ৪-৫ পয়েন্ট কমলেই প্রকৃত পরিবর্তন অনুভব করেন। এর ফলে রোগী নিজের উন্নতির প্রতি আস্থা হারাতে পারেন। অথচ রোগী যদি নিজেকে ভালো বোধ করেন, তাহলে সেই এক পয়েন্টের উন্নতিও তার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। এখানেই এআই-এর সীমাবদ্ধতা।
এআই-কে নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব, যা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে আরও সঠিক সাড়া দিতে পারে। তবে বর্তমানে বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্য এআই অ্যাপগুলো এখনও উন্নয়ন ও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। গবেষকরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এমসিআইডি পদ্ধতি ব্যবহার করে এআই-এর কার্যকারিতা আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
এখন সমগ্র বিশ্ব একটি বৃহৎ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে এআই মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য সর্বত্র উপলব্ধ। এটি যেমন সহায়ক হতে পারে, তেমনি ক্ষতিকরও হতে পারে। তাই এআই-এর নকশা এবং ব্যবহারে সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি। শেষ পর্যন্ত, রোগী ও থেরাপিস্টের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য বোঝার জন্য এমসিআইডি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে, যদি এআই-কে যথাযথভাবে তৈরি করা হয়।


