মহাবিশ্বের অদৃশ্য কণাগুলো কীভাবে কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়াই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তা বিজ্ঞানের এক বড় বিস্ময়। পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে শুরু হয় কোয়ান্টাম জগতের রহস্য; আলবার্ট আইনস্টাইন যাকে বলেছিলেন, দূর থেকে ঘটে যাওয়া এক ভৌতিক কর্মকাণ্ড। কণার এই অদ্ভুত মেলবন্ধন নিয়ে বিজ্ঞানীরা দুই দশক আগে এক জটিল তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে শুধু তাত্ত্বিক পর্যায়ে থাকা সেই রহস্যময় কোয়ান্টাম তত্ত্বকে এবার গবেষণাগারে সঠিক প্রমাণ করেছেন ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অস্ট্রিয়া (আইএসটিএ) ও জার্মানির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা অমীমাংসিত কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট তত্ত্বের পরীক্ষামূলক প্রমাণও তুলে ধরেছেন। এই গবেষণা কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের শক্তি বৃদ্ধিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কণাগুলোর একে অপরের সঙ্গে এই অচেনা সংযোগকে বলা হয় কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট। অতিপারমাণবিক কণাগুলোর এই অদ্ভুত সংযোগের ওপর ভর করেই ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হচ্ছে। এবার বিজ্ঞানীরা আলোর কণার একটি কোয়ান্টাম বাথ ব্যবহার করে পৃথক কিউবিটের মধ্যে সংযোগ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। প্রচলিত কম্পিউটারে বিট ব্যবহার করা হয়, যার মান ০ অথবা ১ হতে পারে। অন্যদিকে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কিউবিট একই সঙ্গে ০ ও ১ উভয় অবস্থাতেই থাকতে পারে।
আইএসটিএর পদার্থবিজ্ঞানী আলেজান্দ্রো আন্দ্রেস-জুয়ানেস জানান, তাঁদের লক্ষ্য ছিল সহজলভ্য ও বাস্তবসম্মত এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের মধ্যে থাকা দূরত্ব দূর করা। দূর থেকে এন্ট্যাঙ্গেলড অবস্থাকে স্থিতিশীল করার মাধ্যমে এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠেছে; এতে কোনো সক্রিয় নিয়ন্ত্রণ বা পরিমাপের প্রয়োজন হয় না। আইএসটিএর আরেক পদার্থবিজ্ঞানী জোহানেস ফিংক বলেন, এই পদ্ধতিতে এন্ট্যাঙ্গেলড কিউবিটের অবস্থা স্থিতিশীল থাকে এবং এটি কিউবিটের নিজস্ব আয়ুষ্কালের পরেও বজায় থাকে। ফলে পরবর্তী কোয়ান্টাম প্রসেসিংয়ের জন্য এটি সব সময় প্রস্তুত পাওয়া যায়, যা ধারণাগত দিক থেকে গবেষণাটিকে অত্যন্ত অর্থপূর্ণ করে তুলেছে।
বিজ্ঞানীরা তাঁদের পরীক্ষায় কম শক্তির মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে দুটি বিচ্ছিন্ন কিউবিটকে যুক্ত করেছেন। পরীক্ষাগারে ৫০ সেন্টিমিটার বা ২০ ইঞ্চি তার দিয়ে কিউবিটগুলো আলাদা রাখা হয়েছিল। তাঁদের দাবি, এই প্রযুক্তি যেকোনো দূরত্বের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা সম্ভব। কোয়ান্টাম জগতে পরিমাপের ক্ষেত্রে এক ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। এ বিষয়ে আলেজান্দ্রো আন্দ্রেস-জুয়ানেস বলেন, কিউবিট বিভিন্ন অবস্থার মিশ্রণে থাকতে পারে, কিন্তু যখনই সেগুলো পরিমাপ করা হয়, তখন সব অবস্থা ভেঙে পড়ে কেবল ০ বা ১ অবস্থায় পরিণত হয়। প্রচলিত এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট পদ্ধতির তুলনায় এই নতুন স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি অনেক বেশি টেকসই, তবে দক্ষতার দিক থেকে এটি এখনো শুরুর ধাপে রয়েছে। বর্তমানে এই পদ্ধতি কোয়ান্টাম বাথ থেকে উপলব্ধ এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের প্রায় ১০ শতাংশ স্থানান্তর করতে পারে। তাঁরা একটি তুলনামূলক সহজ পদ্ধতি উপস্থাপন করেছেন, যা একাধিক দূরবর্তী কিউবিটকে সিঙ্ক বা যুক্ত করার জন্য ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট




