সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফ-এর মধ্যে তিন বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে উত্তর কোর্ডোফান রাজ্যের রাজধানী এল-ওবেইদ শহর। প্রায় পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এই শহরটি সম্প্রতি ড্রোন হামলায় জর্জরিত। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা অ্যাকলেডের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে শহরটিতে ২৭টি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর যেকোনো মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্ক জানিয়েছেন, ৬ জুন থেকে ২৮ জুনের মধ্যে পরিচালিত ১৫টি ড্রোন হামলায় কমপক্ষে ৪৫ জন নিহত ও ৪১ জন আহত হয়েছেন। জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে দেওয়া ভাষণে টুর্ক সতর্ক করে বলেন, এল-ওবেইদ থেকে প্রাপ্ত ইঙ্গিত সুস্পষ্ট যে সুদানে আরেকটি মানবাধিকার বিপর্যয় ঘটতে চলেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত ১৮ মাস ধরে শহরটি অবরোধ-সদৃশ পরিস্থিতির সম্মুখীন এবং পলায়নপর মানুষের ব্যবহার করা পথে সংক্ষিপ্ত বিচার, অপহরণ, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এল-ওবেইদ নিয়ে বর্তমানে এল-ফাশেরের মতো জাতিগত সহিংসতার তেমন সম্ভাবনা নেই। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাবের নির্বাহী পরিচালক নাথানিয়েল রেমন্ডের মতে, এখন পর্যন্ত আরএসএফের বড় পরিসরে আক্রমণের পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব আগ্নেস ক্যালামার্ড সতর্ক করেছেন যে এল-ফাশেরে যা ঘটেছে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং একটি নির্দিষ্ট কৌশলের অংশ। এল-ফাশেরে ১৮ মাস অবরোধের পর আরএসএফ শহরটি দখল করে নেয় এবং মাত্র তিন দিনে ছয় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়, যাকে জাতিসংঘ 'গণহত্যার উপসর্গ' বলে বর্ণনা করেছিল।

এল-ওবেইদে হামলায় মূলত জ্বালানি স্টেশন ও তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মে মাসের শেষ থেকে জুন মাসের শেষের মধ্যে কমপক্ষে আটটি জ্বালানি স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে শহরে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে এবং দাম ব্যাপক বেড়ে গেছে। রেমন্ডের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যহত হলে পানির পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বাস্তুচ্যুত মানুষকে দূষিত পানি পান করতে বাধ্য করবে এবং জলবাহিত রোগ ছড়াতে পারে। শহরের প্রধান বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন এবং আবাসিক এলাকা ও বাজারেও হামলা চালানো হয়েছে যেন দৈনন্দিন জীবন স্তব্ধ করে দেওয়া যায়।

শহরটিতে প্রায় এক লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন, যারা অন্যান্য এলাকা থেকে পালিয়ে এসে এল-ওবেইদকে নিরাপদ ভেবেছিলেন। ড্রোন হামলা তীব্র হওয়ায় তারাও এখন অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছেন। রেমন্ড জানান, এক মাসের মধ্যেই এল-ওবেইদের আশপাশের শিবিরগুলিতে প্রায় ৭০০ অস্থায়ী স্থাপনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় এক হাসপাতালের চিকিৎসক বিবিসিকে জানান, প্রতিটি ড্রোন হামলার পর আহত রোগীদের চাপ মোকাবিলায় তারা হিমশিম খাচ্ছেন। বেশিরভাগ আহতের হাত-পায়ে আঘাত, কেউ কেউ মাথায় জখম হয়েছেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ছিল সাত মাস বয়সী এক শিশু, যার হাতের গুরুতর আঘাতের কারণে হাত কেটে ফেলা হলেও শিশুটি বাঁচেনি। চোখের পানি ধরে রেখে চিকিৎসক বলেন, 'পরিস্থিতি ভীতিকর। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মনে হয় আর ফিরে আসা হবে না। ড্রোনের কারণে আমরা সত্যিই কষ্ট পাচ্ছি— কেউ জানে না কখন কীভাবে মৃত্যু আসবে।'

স্থানীয় বাসিন্দা সাহারা (ছদ্মনাম) বিবিসিকে বলেন, তিনিও একটি জ্বালানি স্টেশনে ছিলেন যখন প্রথম ড্রোন হামলা হয়। দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার সময় তিনি গাড়ির বাইরে থাকায় পা ও হাতে স্প্লিন্টার আঘাত করে। তিনি ভাগ্যবান যে বেঁচে গেছেন, তবে অনেকে এত ভাগ্যবান নন। সাহারা বলেন, মানুষ এখন পরিবারকে বিদায় জানিয়ে বাসা থেকে বের হয়, কারণ তারা জানে না ফিরতে পারবে কিনা। আরএসএফ অবশ্য দাবি করেছে, তারা এল-ওবেইদের বাসিন্দাদের সুরক্ষায় 'একনিষ্ঠভাবে কাজ করবে' এবং আন্তর্জাতিক আইন পুরোপুরি মেনে চলছে। তবে অ্যাকলেডের নোয়াদ এলতায়েব বলেছেন, আরএসএফ কার্যকরভাবে উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ থেকে শহরটি ঘিরে ফেলেছে, কিন্তু সেনাবাহিনী মিত্র মিলিশিয়াদের সঙ্গে একযোগে পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ করিডোর ধরে রেখেছে। তার মতে, আরএসএফের পক্ষে শহরটি পুরোপুরি দখল করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এড়িয়ে যাওয়া এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।