পাবনার হোসিয়ারি শিল্পের গোড়াপত্তন প্রায় দুই শতাব্দী আগে। এক সময় ইছামতী নদীপথে পণ্য আমদানি-রপ্তানি হতো। দেশভাগের পর ব্যবসায়ীদের অনেকেই ভারতে চলে গেলে শিল্পে ভাটা পড়ে। পরে ধীরে ধীরে মুসলমান উদ্যোক্তাদের হাতে আসে এর নিয়ন্ত্রণ। নব্বইয়ের দশকে তৈরি পোশাক কারখানার ঝুট কাপড় দিয়ে গেঞ্জি, শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটার প্রভৃতি উৎপাদন শুরু হয় এবং শিল্পটি আবার চাঙ্গা হয়। ভারত, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এর পণ্য রপ্তানি হতে থাকে।
বর্তমানে সেই শিল্প চরম সংকটের সম্মুখীন। ভারতের সঙ্গে স্থলপথে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদনে টানা পতন দেখা দিয়েছে। জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, এই জেলায় প্রায় তিন হাজার হোসিয়ারি কারখানা ছিল, যেখানে লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করতেন। কিন্তু রপ্তানি বন্ধের কারণে বর্তমানে ৬৫ শতাংশ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেক কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ। যেগুলো চলছে, সেখানেও শ্রমিক সংখ্যা অর্ধেকেরও কমিয়ে আনা হয়েছে।
সংস্থাটির সভাপতি সেলিম সরদার জানান, দেশের হোসিয়ারি পণ্যের শতকরা ৬৫ ভাগই পাবনা থেকে রপ্তানি হতো। এখন প্রতিদিনই মালিক ও পাওনাদারদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিচ্ছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। শিল্পটিকে বাঁচাতে দ্রুত পরিবর্তন প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় উদ্যোক্তারাও একই অবস্থার কথা জানিয়েছেন। শহরের সাধুপাড়া মহল্লার ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন ব্যাংক ঋণ নিয়ে কারখানা গড়ে তোলেন। সেখানে ৪০০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছিল। কিন্তু রপ্তানি বন্ধের পর পণ্য বিক্রি করতে না পেরে তাকে কারখানা বন্ধ করে দিতে হয়। এখন তিনি দেনার দায়ে দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। দ্বীপচরের উদ্যোক্তা মিরাজুল ইসলাম বলেন, তার উৎপাদিত পণ্যের দুই-তৃতীয়াংশই ভারতে যেত। সপ্তাহে প্রায় ২৫ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি হতো। এখন কোনো আয় নেই। ব্যাংকের ঋণ নিয়ে তিনি চিন্তিত।
শ্রমিকদের অবস্থাও শোচনীয়। কারখানার কাজ হারিয়ে আফজাল হোসেন এখন অন্য কাজের সন্ধান করছেন। এসবি রয়েল গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক আশিক হোসেন বলেন, আগে কাজের চাপে দম ফেলার সময় ছিল না, এখন তারা অলস বসে দিন কাটাচ্ছেন। জনি গার্মেন্টসের কামরুল হাসান জানান, স্থলপথে পণ্য পাঠাতে দুই-তিন দিন সময় লাগত, পাঁচ দিনের মধ্যে টাকা পাওয়া যেত। এখন নৌপথে ২০-২৫ দিন সময় লাগছে, টাকা আসছে আরও দেরিতে। ফলে অল্প পরিমাণ পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। আগে প্রতি সপ্তাহে শতাধিক ট্রাক পাবনা থেকে ভারতে পণ্য নিয়ে যেত, যা এখন কমে সাত-আট ট্রাকে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে সপ্তাহে দেড় থেকে দুই লাখ ডলার আয় হতো, যা এখন প্রায় নেই বললেই চলে।
অন্যান্য উদ্যোক্তারাও একই চিত্র তুলে ধরেন। সাধুপাড়া ঝুটপল্লির ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, গত দেড় বছর ধরে তেমন বিক্রি নেই। গুদামভর্তি কাপড় নিয়ে বসে আছেন। তার ১৫ জন কর্মীর মধ্যে ১০ জনকে ছাঁটাই করতে হয়েছে। আরেক উদ্যোক্তা ফারুক হোসেন জানান, ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছিলেন। দেশের তুলনায় বিদেশি বাজার ভালো ছিল, কিন্তু এখন সবাই বড় সংকটে পড়েছেন। এ আর কর্নারের তরুণ দাস বলেন, রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় কাজ নেই। স্ত্রী অসুস্থ, চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে পারছেন না। পরিবার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে।
পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক এ বি এম ফজলুর রহমান বলেন, এটি পাবনার ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এই শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও এখন চরম সংকটে পড়েছে। সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন এই সংকট কাটাতে। দ্রুত আমদানি-রপ্তানির স্থলপথ খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।




