ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে হেইফার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে ‘উত্তম কৃষি চর্চা (GAP) ও খাদ্য ব্যবস্থা: টেকসই বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সরকারি নীতিনির্ধারক, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি ও কৃষকরা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল জানান, ২০২০ সালে নীতিমালা প্রণয়নের পর থেকে উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয় এবং ২০২৩ সালে মানদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার পর মাত্র তিন বছরে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে এই প্রত্যাশা পূরণে কৃষক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও গণমাধ্যম—সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। বাজারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, জেলা পর্যায়ে বিপণন কর্নার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বড় বিপণিবিতানগুলো এগিয়ে এলে উৎপাদকরা আরও উৎসাহিত হবেন। বর্তমানে ব্যক্তির চেয়ে দলভিত্তিক সনদ প্রদানে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
হেইফার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর নূরুন নাহার কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, কৃষক লাভবান না হলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে আগ্রহ হারাবেন। অধিকাংশ কৃষকই চান না তাঁদের সন্তান এই পেশায় আসুক, কারণ তাঁরা মর্যাদা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত। তাই নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে কৃষকদের যুক্ত করা এবং সমবায়ভিত্তিক সংগঠনের মাধ্যমে নারী কৃষকদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংক সংযোগে সহায়তা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) পরিচালক যাকীয়াহ্ রহমান মনি উত্তম কৃষিচর্চার পাঁচটি মডিউলের আওতায় প্রশিক্ষণ, নথি সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বিত কাঠামোর কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, টেকসই বাস্তবায়নের জন্য বাজার সৃষ্টি ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য। খণ্ডিত জমি, সংগ্রহকেন্দ্রের অভাব ও পরীক্ষাগার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ধাপে ধাপে মোকাবিলা করা হচ্ছে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মো. আফছার আলী সুষম সার প্রয়োগের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি জানান, ইউরিয়া, টিএসপির পাশাপাশি গন্ধক, দস্তা, বোরনের মতো অণুপুষ্টি উপাদান ব্যবহারে ফলন ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। অনলাইনে সার সুপারিশ ব্যবস্থা চালু থাকলেও ভারী ধাতু পরীক্ষার মতো ব্যয়বহুল ও সংবেদনশীল তথ্য যাচাই-বাছাই করে গণমাধ্যমে প্রকাশের পরামর্শ দেন তিনি।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গ্যাপ বিশেষজ্ঞ এম নাজিম উদ্দিন সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশে এখনো ২৫টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি শনাক্তযোগ্যতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল কৃষক কার্ডের সঙ্গে উত্তম কৃষিচর্চার তথ্য যুক্ত করার প্রস্তাব দেন এবং এটিকে একটি ব্যবসাভিত্তিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর দেন।
নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার এ কে ওসমান হারুনী উত্তম কৃষিচর্চাকে নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত করার কথা বলেন। তিনি অভিমত দেন, শুধু কৃষককে চাপ দিয়ে নয়; বীজ, সার সরবরাহকারী থেকে ক্রেতা—সবার দায়িত্ব রয়েছে এবং শীতল সংরক্ষণাগার ও সরবরাহব্যবস্থায় প্রণোদনা প্রয়োজন।
ইস্পাহানি এগ্রো লিমিটেডের পরিচালক ফৌজিয়া ইয়াসমিন বাজার বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, জৈব বালাইনাশকে উৎপাদিত নিরাপদ পণ্য বাজারে গিয়ে সাধারণ পণ্যের সঙ্গে মিশে যায়, ফলে কৃষকের বাড়তি চেষ্টার স্বীকৃতি মেলে না। নিরাপদ পণ্যের জন্য কিউআর কোড বা প্রতীক চালুর পাশাপাশি উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্�লে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগিদ দেন তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ জানান, পার্টনার প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ সপ্তাহব্যাপী কৃষক মাঠবিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কাগজভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে।
যশোরের কৃষক লাবনী খাতুন তাঁর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি জানান, মাটি পরীক্ষা করে সুষম সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করলেও বাজারে নিরাপদ পণ্যের আলাদা দাম না পাওয়ায় কৃষক নিরুৎসাহিত হন। সঠিক হিসাব সংরক্ষণ শুরু করার পর লাভ-ক্ষতির প্রকৃত চিত্র বুঝতে সুবিধা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যশোরের উপপরিচালক মো. মোশারেফ হোসেন মনে করেন, উত্তম কৃষিচর্চার ২৪৬টি অনুশীলনকে সহজভাবে উপস্থাপন করা গেলে এবং প্রশিক্ষণের মেয়াদ বাড়ানো হলে বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।
শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, উৎপাদনের পর ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। পুষ্টিকর খাদ্য ও রপ্তানি এখন অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। তিনি গবেষণার বরাত দিয়ে জানান, প্রশিক্ষিত কৃষকেরা ভালো চর্চা শুরু করলেও ট্রেসেবিলিটি ও বাজারসংযোগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
গ্রামীণ ডানোন ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীপেশ নাগ বলেন, সচেতনতা ও অংশীদারত্বই মুখ্য। তিনি ওষুধশিল্পের মতো কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায়ও মান অনুসরণ বাধ্যতামূলক করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। কন্ট্রোল ইউনিয়নের অয়ন বিশ্বাস সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ উত্তম কৃষিচর্চার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের ওপর জোর দেন।
সবশেষে বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে, উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার, নিরাপদ পণ্যের ন্যায্যমূল্য ও আলাদা বাজার নিশ্চিতকরণ, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং নারী-তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ত করা জরুরি।




