রাত গভীর। ঢাকার একটি আবাসিক এলাকার ছোট্ট কক্ষে ল্যাপটপের পর্দার আলোয় উদ্ভাসিত তরুণ রোহান। পেশায় গ্রাফিক ডিজাইনার এই তরুণ ‘জেন-জি’ প্রজন্মের একজন সফল প্রতিনিধি। দীর্ঘ কয়েক মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর সম্প্রতি তিনি নিজের প্রথম বড় প্রকল্পটি শেষ করেছেন— একটি মার্কিন স্টার্টআপের জন্য ব্র্যান্ড লোগো নকশা। ড্যাশবোর্ডে যখন ‘১০০০ ডলার’ লেখাটি ভেসে উঠল, রোহানের মনে হলো যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখ এই চারটি অঙ্কের মাঝেই নিহিত।

তবে রোহানের এই আনন্দ ক্ষণস্থায়ী প্রমাণিত হলো। শুরু হলো এক নতুন দুশ্চিন্তা—কীভাবে এই উপার্জিত অর্থ সর্বোচ্চ পরিমাণে ও নিরাপদে দেশে পৌঁছানো যায়? অর্থ প্রেরণের পথে বাধাগুলো যেন সুবিশাল পর্বতের মতো। রোহান বুঝতে পারলেন, বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং এখন একটি প্রায়-প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু অর্থ দেশে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়াটি আজও নানা জটিলতায় ভরা। গেটওয়ে মাশুল, মুদ্রা রূপান্তরের হার এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক ফ্রিল্যান্সারই মাঝপথে তাঁদের মোট আয়ের ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেন।

রোহান লক্ষ্য করলেন, তার ক্লায়েন্ট পেপ্যালের মাধ্যমে অর্থপ্রদানে আগ্রহী, কিন্তু বাংলাদেশে পেপ্যালের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ প্রাপ্তির সুবিধা এখনো চালু হয়নি। যদিও সরকার এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, বর্তমান বাস্তবতায় এর সরাসরি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার এক বন্ধু পেওনিয়ার ব্যবহারের পরামর্শ দিলেন, যার মাধ্যমে ক্লায়েন্টের কাছে অনুরোধ পাঠিয়ে পেপ্যাল থেকে অর্থ উত্তোলন করা সম্ভব।

পেওনিয়ার ও এলিভেট পে-র মধ্যবর্তী হিসেবে নিকাশ

রোহান শুধু একজন দক্ষ ডিজাইনারই নন, বরং নিজের অর্থের প্রতিটি পয়সার সঠিক হিসাব রাখতেও সমান দক্ষ। তিনি বাজারে প্রচলিত দুই শীর্ষ লেনদেন প্ল্যাটফর্ের সুবিধা-অসুবিধা খতিয়ে দেখতে শুরু করলেন।

প্রথমেই তার নজরে এলো পেওনিয়ার, যা বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার সম্প্রদায়ের জন্য একটি অপরিহার্য মাধ্যম হিসাবে বিবেচিত। আপওয়ার্ক বা ফাইভআরের মতো প্ল্যাটফর্মের সাথে এর সংযোগ অত্যন্ত সহজ এবং এটি সরাসরি মোবাইল আর্থিক সেবা দিয়েও টাকা তোলা যায়। তবে হিসাব করতে গিয়ে রোহান দেখলেন, পেওনিয়ার- এ মুদ্রা রূপান্তরের ক্ষেত্রে মার্কাপ ফি প্রায় ২.৫ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায়। তার মানে, আন্তঃব্যাংক দর যদি ১২০ টাকা হয়, তাহলে রোহান কার্যকরভাবে পাবেন প্রায় ১১৬.৫০ টাকার মতো। তাঁর ১,০০০ ডলার আয়ের জন্য প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ডলার খরচ হয়ে যাবে কেবল রূপান্তর ফি বাবদ।

অন্য বিকল্প হিসেবে তিনি পরিচিত হলেন এলিভেট পে-র সাথে। এটি একটি আধুনিক ফিনটেক সমাধান, যা ফ্রিল্যান্সারদের একটি ভার্চুয়াল ইউএস ব্যাংক হিসাব (এসিএইচ) সরবরাহ করে। এর মূল সুবিধা হলো, এটি আন্তঃব্যাংক দরের খুব কাছাকাছি একটি প্রতিযোগিতামূলক রেট প্রদান করে এবং স্থানীয় ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তরের জন্য মাত্র ১.৫০ ডলার একটি নির্দিষ্ট ফি ধার্য করে। হিসাব করে রোহান অবাক হয়ে দেখলেন, পেওনিয়ারের তুলনায় এলিভেট পে ব্যবহার করে ১,০০০ ডলার দেশে নিয়ে আসলে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা বেশি সাশ্রয় হবে। রোহান উপলব্ধি করলেন, নির্দিষ্ট মার্কেটপ্লেসের কাজের জন্য পেওনিয়ার শ্রেষ্ঠ হলেও, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সরাসরি ক্লায়েন্টের জন্য এলিভেট পে অধিকতর লাভজনক। তিনি একটি ‘মাল্টি-গেটওয়ে স্ট্যাক’ কৌশল অবলম্বন করার পরিকল্পনা করলেন, যেখানে একাধিক গেটওয়ে ব্যবহার করে নিজের আয়ের সর্বোচ্চ অংশ অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হবে।

ফ্রিল্যান্সারদের জন্য রাষ্ট্রীয় নগদ প্রণোদনা ও সুবিধা বাংকে যোগাযোগ করলে রোহান আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য অবগত হন—বাংলাদেশ সরকার ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নগদ সহায়তা প্রদান করে থাকে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের জন্য সরকার ২.৫ শতাংশ সাধারণ প্রণোদনা বা বোনাস প্রদান করে থাকে। ব্যাংক কর্মকর্তা তাকে বিশদভাবে জানান, যদি লেনদেনের পরিমাণ ৫ লাখ টাকার কম হয়, তাহলে কোনো প্রকার কাগজপত্র জমাদানের প্রয়োজন ছাড়াই এই বোনাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যাবে। তবে লেনদেন ৫ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেলে ইনভয়েস বা কার্যাদেশ দেখাতে হবে। এছাড়াও, রোহান যদি বেসিস থেকে আইটি বা আইটিইএস পরিষেবা রপ্তানিকারক হিসেবে সনদ সংগ্রহ করতে পারেন, তাহলে তিনি আরও বর্ধিত হারে (প্রকারভেদে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত) নগদ প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্য হবেন। এই বোনাসগুলো কারেন্সি কনভার্শনের ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে দেবে।

একজন স্মার্ট ফ্রিল্যান্সার হিসেবে রোহানের নতুন অগ্রযাত্রা এখন শুরু হলো। রোহান এখন আর শুধু একজন ডিজাইনার নন, বরং এক ডিজিটাল এন্ট্রাপ্রেনিউর। তিনি স্বীয় কাজের পদ্ধতি আরও সহজ করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। প্রথমত, আইসিটি বিভাগ থেকে একটি ভেরিফায়েড ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড সংগ্রহ করলেন, যা ব্যাংকে তার আয় যাচাই করার প্রক্রিয়া সহজতর করে দিল। দ্বিতীয়ত, তিনি ব্যাংকে একটি এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) অ্যাকাউন্ট খোলার বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করলেন। এই অ্যাকাউন্ট তার আয়ের একটি অংশ ডলারে সংরক্ষণের সুযোগ দেবে, যা দিয়ে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক কেনাকাটা বা ফেসবুক-গুগলের মতো প্লাটফর্মের বিজ্ঞাপন বিল বিনা মুদ্রা রূপান্তর ক্ষতিতে পরিশোধ করা যাবে। শেষ কথা, রোহান প্রতিটি পেমেন্টের ইনভয়, ওয়ার্ক অর্ডার এবং ব্যাংক সরবরাহীকৃত পিআরসি বা ফর্ম-সি অত্যন্ত যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করতে শুরু করলেন।

রোহানের গল্পটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়; এটি বাংলাদেশের অগণিত তরুণ ফ্রিল্যান্সারের প্রতিচ্ছবি। বৈশ্বিক পেমেন্ট সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা বা ব্যাংকিং প্রক্রিয়াগত জড়তা থাকলেও, সঠিক পরিকল্পনা এবং স্মার্ট কৌশলের মাধ্যমে এই সকল বাঁধা সফলভাবে অতিক্রম করা সম্ভব। রোহান এখন পুরোপুরি জানে, ১,০০০ ডলার মানে শুধুই ১,০০০ ডলার নয়; সঠিক গেটওয়ে নির্বাচন এবং সরকারি প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধা সঠিকভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমে এটি তার জন্য আরও বড় অঙ্কের ‘স্বস্তিতে’ রূপান্তরিত হতে পারে। জেন-জি প্রজন্ম হিসেবে রোহান বা আপনার কাজ শুধু বিশ্বম্প্রদায়ে সেবা প্রদান নয়, বরং নিজের কঠোর উপার্জিত অর্থ বুদ্ধিদীপ্ততার সঙ্গে দেশে এনে ব্যক্তিগত এবং জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রাখা।