চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম সড়ক সুড়ঙ্গপথটি চালু হওয়ার পর থেকেই আর্থিক সংকটে পড়েছে। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি বর্তমানে প্রতিমাসে গড়ে ৮ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। টোল থেকে প্রাপ্ত আয় রক্ষণাবেক্ষণ খরচের তুলনায় অনেকটাই কম। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, দৈনিক গড়ে ২৮ হাজার যানবাহন চলাচল করবে, কিন্তু বাস্তবে তা মাত্র ৪ হাজারের কাছাকাছি। ধারণার চেয়ে যানবাহনের সংখ্যা ১৪ শতাংশে নেমে আসায় আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় টানেল প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বিলাসবহুল একটি অতিথিশালা ইজারা দিয়ে অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজছে সেতু বিভাগ। আনোয়ারা উপজেলার পারকি খালের পাশে প্রায় ৭২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা সার্ভিস এরিয়ায় অবস্থিত এই অতিথিশালাটি এখন পর্যন্ত চালু হয়নি। এর মূল কারণ হিসেবে জনবলের অভাবকে চিহ্নিত করছেন কর্মকর্তারা। অতিথিশালায় প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি আধুনিক বাংলো রয়েছে, যাতে ছয়টি কক্ষ ও একটি সুইমিংপুল আছে। এছাড়া ৩০টি রেস্টহাউস, একটি সম্মেলনকেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হেলিপ্যাড, মসজিদ, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন এবং একটি জাদুঘরও রয়েছে সার্ভিস এরিয়ায়।

অতিথিশালাটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তৃতীয়বারের মতো। এর আগে গত বছরের জুলাই ও সেপ্টেম্বরে দুটি দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রত্যাশিত দর পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও তাদের প্রস্তাবিত অর্থ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ছিল। এবারের দরপত্রে ১৩টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণের জন্য দরপত্র কিনেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খান প্রোপার্টিজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৩ জুলাই। নির্বাচিত ইজারাদারকে ২৯ বছরের জন্য সম্পত্তিটি হস্তান্তর করা হবে, এবং তারা ‘যেমন আছে’ ভিত্তিতে সব স্থাপনা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাবে।

সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানিয়েছেন, টানেল প্রকল্প থেকে আয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। নির্মাণ ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে একটি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, এবং সেই লক্ষ্য পূরণ হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইজারাদার রুম সার্ভিস, খাবার, ভ্রমণ, সম্মেলন ও স্পাসহ বিভিন্ন সেবা চালু করতে পারবে এবং মূল্য নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা পাবে। তবে কোনো নতুন নির্মাণ বা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য সেতু কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টানেলটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। সম্প্রতি সরকারের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টোল হার বাড়িয়ে লোকসান কমানো সম্ভব নয়। বরং আনোয়ারা প্রান্তে বন্দরভিত্তিক শিল্প দ্রুত গড়ে তোলা এবং কর্ণফুলী ড্রাই ডক, চায়না ইপিজেড ও কোরিয়ান ইপিজেডের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। গত ৯ জুন একনেক সভায় আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়নে ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা টানেলের ব্যবহার বাড়াতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পটি চীনের অর্থায়নে এবং জিটুজি ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছে। ২০১৫ সালে অনুমোদন পেলেও নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। ব্যয় বাড়তে বাড়তে শেষ পর্যন্ত তা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায়। সর্বশেষ গত বছর জানুয়ারিতে আরও ৩১৫ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়, যার বড় অংশ অতিথিশালার আসবাব ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী কেনায় ব্যয় হয়েছে।