ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে টানা ২১ দিন অচেতন থাকার পর গতকাল শুক্রবার রাতে কলেজশিক্ষক আরিফুল ইসলামের (৩৪) মৃত্যু ঘটে। রাত আটটার দিকে তাঁর প্রাণ যায়। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া গ্রামের বাসিন্দা এই শিক্ষক মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন সোচ্চার ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে গভীর রাতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং চারটি বাড়ির আগুন নেভান।
আরিফুল ইসলাম লালমনিরহাট সরকারি পলিটেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করতেন। নিজ গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, ১ আগস্ট বিকেলে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে গন্ধমরুয়া গ্রামে ধারালো অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সর্বশেষ তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছিল।
মামলার প্রধান আসামি রহিদুল ইসলামকে গত ১৩ আগস্ট র্যাব গ্রেপ্তার করে। ২ আগস্ট তাঁর বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক ১০ জনকে আসামি করে আদিতমারী থানায় মামলা দায়ের করেন। গতকাল রাতে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রহিদুলসহ সাতজনের বাড়িতে স্থানীয়রা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মুক্তি মাহমুদ প্রথম আলোকে জানান, খবর পেয়ে কর্মীরা গিয়ে চারটি বাড়ির আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
আরিফুলের স্ত্রী মাকামাম মাহমুদা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁদের একটি দুই বছর চার মাস বয়সী কন্যা এবং একটি নবজাতক পুত্র রয়েছে। শনিবার দুপুরে গন্ধমরুয়া গ্রামে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনেরা আহাজারি করছেন এবং প্রতিবেশীরা ভিড় করছেন। নবজাতক সন্তানকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মাহমুদা। তিনি বলেন, তাঁর স্বামী মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন এবং মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, সন্তানদের এতিম করা ব্যক্তিদের ফাঁসি হওয়া উচিত।
জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান শনিবার দুপুরে সমবেদনা জানাতে গিয়ে নবজাতক সন্তানকে কোলে নেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব সহায়তার আশ্বাস দেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুস সাকিব সজীব জানান, আগের হত্যাচেষ্টার মামলাটি এখন হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে এবং আদালতে আবেদন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রধান আসামি কারাগারে রয়েছেন, বাকিরা পলাতক বা জামিনে রয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন আরিফুল। তাঁর স্ত্রীও একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। চিকিৎসায় প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের লালমনিরহাট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ এস এম আবু হাসনাত জানান। প্রথম জানাজা শনিবার বিকেলে ঢাকার সেগুনবাগিচায় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় জানাজা রোববার দুপুরে গ্রামের বাড়িতে হবে।




