অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ন্ত্রণ এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ভিসা সুবিধা কমানোর যে প্রস্তাব সামনে এসেছে, তা নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। দেশটির অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অবদান অপরিসীম, তবুও আবাসনসংকট, বাড়তি ঘরভাড়া এবং নাগরিক পরিষেবার ওপর চাপের কথা তুলে অভিবাসন কঠোর করার দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। সংসদ এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি যুক্তি চলছে।

কট্টর ডানপন্থী ‘ওয়ান নেশন’ দলের নেতা পলিন হ্যানসন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্বামী, স্ত্রী কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় আসার পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, বিদেশি শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনার জন্যই দেশে আসেন, তাই পরিবারের সঙ্গী করতে চাইলে নিজ দেশে থেকে অনলাইনে ক্লাস করাই উচিত। অন্যদিকে, বিরোধী দল কনজারভেটিভ জোট স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি সীমিত করার পক্ষে মত দিচ্ছে।

ক্ষমতাসীন লেবার সরকার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নির্দিষ্ট সীমায় বাঁধতে আইনগত উদ্যোগ নিলেও সেটি সংসদের উচ্চকক্ষে আটকে গেছে। তবে এরই মধ্যে সরকার বেশ কিছু কঠোর শর্ত কার্যকর করেছে—‘জেনুইন স্টুডেন্ট’ যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার, ইংরেজি ভাষার ন্যূনতম স্কোর বৃদ্ধি এবং ব্যাংক ব্যালান্সে দেখাতে হবে এমন তহবিলের পরিমাণ বাড়ানো। এই উদ্যোগগুলো মূলত ভুয়া আবেদন ঠেকাতে এবং প্রকৃত শিক্ষার্থীদের যাচাইয়ে নেওয়া হয়েছে।

এমন নীতিগত কড়াকড়িতে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে সিডনি ও অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য শহরে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী ও প্রবাসীদের মধ্যে। তাঁদের ধারণা, এই পরিবর্তন শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীদের নয়, ভবিষ্যতে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জীবনেও বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সিডনির স্থানীয় ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম মনে করেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা শুধু অর্থ খরচ করতেই আসেন না, তারা কঠোর পরিশ্রম করে স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। হঠাৎ পরিবারের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা এলে ভালো শিক্ষার্থীরা অন্য দেশ বেছে নেবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

সিডনির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তানজিনা রহমানের ভাষ্য, দীর্ঘ পড়াশোনার পথে মানসিক সমর্থনের জন্য পরিবারের পাশে থাকা অত্যন্ত জরুরি। জীবনসঙ্গীকে সঙ্গে আনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে। নীতি পরিবর্তন স্বাভাবিক, তবে তা যেন অমানবিক না হয়—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।

শিক্ষা খাতের উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত কঠোর নীতি নেওয়া হলে বিশ্ব শিক্ষাবাজারে অস্ট্রেলিয়ার সুনাম ও ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সরকার জানিয়েছে, উচ্চশিক্ষার মান ধরে রাখা এবং স্থানীয় অবকাঠামোর চাপ কমানোর স্বার্থেই অভিবাসন নীতিতে শৃঙ্খলা আনা জরুরি।